বয়স্কদের সুস্থতায় পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

0

বয়স বাড়ছে, বাড়বেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরেও পরিবর্তন আসবে; কারো কম, কারো বেশি। শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে, ম্লান হবে সঞ্চিত শক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসবে। বয়স্ক ব্যক্তির শারীরিক অসুখ-বিসুখ এবং এ সময় ভালো থাকার উপায় সম্পর্কে বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম শহীদুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অদ্বৈত মারুত

বয়স্ক মানুষ বিভিন্ন ধরনের অসুখের সম্মুখীন হয়ে থাকেন। বয়স্কদের রোগের লক্ষণের মধ্যে কোনো ভিন্নতা আছে কী?

অধ্যাপক ডা. এম শহীদুর রহমান : বয়স বাড়ছে, বাড়বেই। এর সঙ্গে শরীরে জৈবনিক পরিবর্তন হবেই- কারো কম, কারো বেশি। বার্ধক্যের সঙ্গে শারীরিক বৈশিষ্ট্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যেমন- অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্ষমতা বা ধকল সহ্য করার ক্ষমতা কমে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় এটির নাম হোমিওস্টেনোসিস। বয়স ত্রিশ বছরে পা দেওয়ার পর থেকেই পরিবর্তনগুলো ক্রমে অগ্রসর হতে থাকে। তবে শারীরিক এ পরিবর্তনের হার এবং পরিধি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিভিন্ন ধরনের হতে থাকে।

এ সময় শরীরের স্নায়ুতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, রক্ত সংবহনতন্ত্র, হৃৎপি-, কিডনি, পরিপাকতন্ত্র, হাড়, মাংসপেশি ইত্যাদি প্রায় সব অঙ্গেই পরিবর্তন হতে থাকে। এ পরিবর্তনে প্রভাবান্বিত হয় খাদ্যাভ্যাস, ব্যক্তিগত অভ্যাস, পরিবেশ ও জেনেটিক উপাদানের মাধ্যমে। বয়স্করা এ সময় যে ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকেন, যেমন- মাথাঘোরা, শারীরিক দুর্বলতা, ভালো না লাগা ইত্যাদি সন্তান বা অন্য কারো সঙ্গে লজ্জায় বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক, প্রকাশ করতে চান না। মনে করেন, এগুলো খুব স্বাভাবিক। এসব সাধারণ লক্ষণ যে মারাত্মক কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে, সে ধারণা তারা পোষণ করেন না। একটি নির্দিষ্ট রোগের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ আছে।

বয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে সেসব লক্ষণ ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হতে পারে। যেমন- ব্রেইন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, নিউমোনিয়া, মূত্রপ্রদাহ বা রক্তশূন্যতা- এগুলো রোগেই রোগীর মানসিক জড়তা এবং প্রস্রাবে নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখা দিতে পারে। আবার বয়স্ক ব্যক্তিটি পড়ে যেতে পারেন, হাঁটুর বাতের কারণে অথবা নিম্ন রক্তচাপের কারণে কিংবা চোখে ছানি পড়ার সমস্যায় পড়তে পারেন। কাজেই রোগ দেখা দিলে দ্রুত নিরাময়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

বার্ধক্যের প্রধান অসুখগুলো কী?
অধ্যাপক ডা. এম শহীদুর রহমান : যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি, তারা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন আর্থ্রাইটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কানে কম শোনা, হৃদরোগ, অর্থোপেডিক সমস্যা (যেমন- হিপ বা মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া), সাইনোসাইটিস, চোখের ছানি, ডায়াবেটিস, চোখে কম দেখা, কানের অসুখ ইত্যাদি রোগে।

বার্ধক্যের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে ‘পড়ে যাওয়া’ খুব গুরুতর সমস্যা। পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর কোনো উপায় আছে কী?
অধ্যাপক ডা. এম শহীদুর রহমান : বৃদ্ধ বয়সে হঠাৎ পড়ে যাওয়া বা পড়ে আহত হওয়া একটি বড় ধরনের সমস্যা। বার্ধক্যে মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে ৬ নম্বর কারণ হচ্ছে পড়ে গিয়ে মৃত্যু। পড়ে গিয়ে মাথায় সামান্য আঘাত পেলেই সেখান থেকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এটা যদি তাড়াতাড়ি ধরা না যায় ও চিকিৎসা করা না যায়, তা হলে রোগী দ্রুত মারা যেতে পারে। উপায় বলার আগে পড়ে যাওয়ার কারণগুলো জেনে নেওয়া যাক-

বৃদ্ধ বয়সে পড়ে যাওয়ার অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে কিছুটা আছে রোগের কারণে, আর কিছুটা আছে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে। রোগের মধ্যে অন্যতম কারণগুলো হলো- চোখে কম দেখা, কানে কম শোনা, মাথা ঘোরানো, মাংসপেশির দুর্বলতা, ভারসাম্যহীনতা ও সমন্বয়হীনতা, মানসিক স্থবিরতা, নিউরোপ্যাথি, পায়ের সমস্যা, ঘুমপাড়ানির ওষুধ ইত্যাদি। হার্ট অ্যাটাক বা সিনকোপের কারণেও পড়ে যেতে পারে। পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা কীভাবে একজন বৃদ্ধের চলাচল বিপজ্জনক করে তুলকে পারে তা খতিয়ে দেখতে হবে। ঘরে অপর্যাপ্ত আলো, অসমান ঘরের মেঝে বা বেখাপ্পা সিঁড়ি পড়ে যাওয়ার কারণ তৈরি করতে পারে।  রান্নাঘর, বাথরুম, বিছানা অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হলে বা ফার্নিচার এলোমেলোভাবে সাজানো থাকলে একজন বৃদ্ধ হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে পারেন। জুতা আরামদায়ক না হলেও পড়ে যেতে পারেন।

তাই এসব বিষয় পরিবারের মানুষদের খেয়াল রাখতে হবে। ঘরের ভেতর বৃদ্ধের চলাফেরা, ওঠাবসা সহজ ও সাবলীল ও ঝুঁকিমুক্ত করতে হবে। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে রোগী যেসব রোগে আক্রান্ত, সেসবের ব্যবস্থা নিতে পরিবারের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। অনেক সময় রোগী শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাফেরা করে থাকেন। হাঁটুব্যথা, মাথাঘোরা পাত্তা দিতে চান না। কাউকে সমস্যার কথা বলেন না। পরিবারের সদস্যদেরও বুঝতে দিতে চান না, তিনি অসুস্থ। হোঁচট খেলেই হুঁশ হয়। কিন্তু বড় অঘটন ঘটে গেলে তেমন কিছু আর করার থাকে না।

পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য করণীয় হলো- চোখে কম দেখলে চশমা নিতে হবে। ছানি থাকলে অপারেশন করাতে হবে। কানে কম শুনলে পরীক্ষা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। মোটকথা, শরীরে যেসব রোগ ক্রমে বাসা বেঁধেছে, সেগুলো নিরাময়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আপনাকে ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ডা. এম শহীদুর রহমান : ­আপনাকে এবং আমাদের সময়ের সব পাঠককে ধন্যবাদ।