ই-সিগারেট কি সিগারেটের থেকেও ক্ষতিকর?

0

অনেকদিন ধরেই সিগারেট ছাড়তে চাইছিলেন। অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। শেষে বিজ্ঞাপন দেখে ই-সিগারেট ব্যবহার করা শুরু করলেন। কিন্তু দিনকয়েক পর থেকেই গলায় অস্বস্তি হতে শুরু করল, সঙ্গে দমের কষ্ট এবং অ্যালার্জি। চিকিৎসক জানালেন, ই-সিগারেট থেকেই সমস্যা দেখা দিয়েছে।

ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ই-সিগারেট ব্যাটারি চালিত এক ধরনের যন্ত্র। তো এই জিনিস দিয়ে কী হয়? যারা ধূমপান ছেড়ে দিতে চান তারা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতেই এই ই-সিগারেট পান করেন। কি থাকে এই ই-সিগারেটের ভেতর?

ইলেকট্রনিক সিগারেটের ভেতরে থাকে নিকোটিনের দ্রবণ যা ব্যাটারির মাধ্যমে গরম হয়। এর ফলে ধোঁয়া তৈরি হয়। এটি মস্তিষ্কে ধূমপানের মতো অনুভূতির সৃষ্টি করে। গত কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বে ইলেকট্রনিক সিগারেটের প্রচলন বেড়েছে। তবে ইউরোপসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে এই সিগারেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, যারা ই-সিগারেট সেবন করছেন তাঁদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে। দি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, ই-সিগারেটে আছে জীবাণুনাশক ফরমালডিহাইড,যেটি ক্যানসার তৈরির উপাদান।

জানুয়ারির ২৮ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়া হেলথ ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ই-সিগারেট মানুষের জন্য হুমকি স্বরূপ এবং এটিকে আইনের আওতায় আনা উচিত। ই-সিগারেট কতটা নিরাপাদ এই বিষয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়েবএমডিতে প্রকাশিত হয়েছে একটি প্রতিবেদন। আসুন জেনে নিই কী রয়েছে ই-সিগারেটে।

গবেষকরা বলছেন, ই-সিগারেটে কী রয়েছে এর কোনো সহজ উত্তর নেই। কারণ ই-সিগারেট তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ তত্ত্বাবধায়নের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। এর কোনো নির্ধারিত মান নেই। কী কী উপাদান দিয়ে এটি তৈরি হয় সে সম্বন্ধেও কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না।

ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)রিভিউর ফলাফলে দেখা গেছে, ১৮টি বিভিন্ন ই-সিগারেটের কয়েকটির মধ্যে টক্সিক এবং কারসিনোজেনিক ক্যামিক্যাল পাওয়া গেছ। কারসিনোজেন ক্যানসার তৈরিকারী উপাদান। এর মধ্যে নিকোটিন রয়েছে। ফলাফলে বলা হচ্ছে, ই-সিগারেট তৈরির মান নির্ণয়ের পদ্ধতিটি অসংগত।

এ ছাড়া ই সিগারেটে আরো কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো জানা উচিত :
ই-লিকুইড : ই-লিকুইড অথবা ই-জুস। এগুলো এমন এক ধরনের দ্রবণ যেগুলো তাপ উৎপাদন করে এবং অ্যারোসোলে রূপান্তর হয়। যেটা বাষ্পায়িত হয়ে বুকের ভেতরে প্রবেশ করে।

নিকোটিন : ই-সিগারেট এবং সাধারণ সিগারেট দুই ধরনের সিগারেটেই নিকোটিন ( নেশা জাতীয় দ্রব্য) থাকে। এটি মস্তিস্কের মধ্য স্নায়ুতে উদ্দীপকের কাজ করে। এটি রক্তচাপ, শ্বাসপ্রশাস এবং হৃদস্পন্দন বাড়ায়।

‘মানুষ সাধারণত ধূমপান করে নিকোটিনের কারণে’, বলে জানিয়েছেন গবেষক ডাক্তার মেসিজ গনিওইজ। তিনি নিউইর্কের রসওয়েল পার্ক সেন্টারের ইনস্টিটিউট ইন বাফেলো এর টোবাকো এবং ই-সিগারেট বিশেষজ্ঞ। ‘নিকোটিনের নেশা তৈরি করে। কিন্তু এটি ক্যানসার তৈরির কারণ নয়। কিন্তু ই-লিকুইডে থাকা অন্যান্য উপাদান বেশ উদ্বেগ জনক।’

ফ্লেভোরিংস : ডাক্তার গনিওইজ জানান, একশোরও বেশি স্বাদের ই-সিগারেট রয়েছে। চেরি, চিজ কেক, সিনামোন, টোবাকো ইত্যাদি। এগুলো সব গন্ধযুক্ত খাবারে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ডায়াসেটিল রয়েছে। এটি সাধারণত পপকর্নের মাখনযুক্ত গন্ধ তৈরি করে। এর সাথে ফুসফুসের রোগের একটি যোগসূত্র রয়েছে এবং এটি বেশ ক্ষতিকরও।

প্রোপাইলিন গ্লাইকোল (পিজি) : পিজি গবেষণাগারে বানানো লিকুইড যা খাদ্য, ওষুধ এবং কসমেটিক বানানোর জন্য নিরাপদ। এটি রক-কনসার্টে কৃত্রিম ধোঁয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ফুসফুস এবং চোখে বিরক্তির উদ্রেগ করে। এটি ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের জন্য ক্ষতিকর। যেমন : অ্যাজমা ও এমপাইসিমা।

গ্লিসারিন : এটি গন্ধহীন এবং বর্ণহীন। তরল গ্লিসারিন অনেকটা মিষ্টি স্বাদের হয়। এটি বিভিন্ন পণ্যে পাওয়া যায়।

ধোয়া তৈরির তরল : ই-সিগারেটে ধোয়া তৈরির জন্য এক ধরনের ই-লিকুইড বা তরল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই ধোয়া শরীরের রক্ত সঞ্চালনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এমন ক্ষতি সত্যিকারের সিগারেটেও হয় না বলে জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালোফোর্নিয়ার অধ্যাপক বেনোউইটজ।

ই-সিগারেটে যেসব ক্যামিক্যাল রয়েছে : ই-সিগারেটে রয়েছে ফরমালডিহাইড ও এসিটালডিহাইড নামের দুটি রাসায়নিক দ্রব্য। এই উপাদান ই-লিকুইডের তাপমাত্রা বাড়ায়। দুর্ভাগ্যবশত এর ফলে আরো নিকোটিন তৈরি হয়। এ মধ্যে থাকা একরোলিন উত্তপ্ত গ্লিসারিন থেকে গঠিত। এটি ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।ধূমপায়ীদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

বস্তুকণা এবং ধাতু
ই-সিগারেটের এরোসোল রয়েছে যেটি ক্ষতিকারক। এটি শরীরে শিরাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শরীরে বিভিন্ন ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে। এবং স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত বা টক্সিক ধাতু ই-সিগারেটের এরোসোলের ভেতর পাওয়া গেছে। যেমন : টিন, নিকেল, ক্যাডিয়াম, লেড ও মারকারি।

ই-সিগারেট কি সিগারেটের থেকেও ক্ষতিকর!
অনেকেই মনে করেন বা বিজ্ঞাপনেও দেখানো হয় ই-সিগারেট ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে সাহায্য করে। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বিতর্ক। ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে এর কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এর প্রভাব সাধারণ সিগারেটের চেয়েও ক্ষতিকারক বলে দাবি করছেন তাঁরা।

তাঁরা জানাচ্ছেন, ই-সিগারেটের তরল মিশ্রণ (ই-লিকুইড)-এর মধ্যে থাকে প্রপেলিন গ্লাইসল, গ্লিসারিন, পলিইথিলিন গ্লাইসল, নানাবিধ ফ্লেভার এবং নিকোটিন। গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রাসায়নিক গুলি থেকে সাধারণ সিগারেটের ধোঁয়ার সমপরিমাণ ফরমালডিহাইড উৎপন্ন হয়। এ ছাড়াও ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে অতিসূক্ষ রাসায়নিক কণা যা ভীষণই ক্ষতিকারক। এর থেকে গলা-মুখ জ্বালা, বমিভাব এবং ক্রনিক কাশি দেখা দিতে পারে।

ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত এর মধ্যে থাকা নিকোটিনের পরিমাণ নিয়ে। ক্যানসার চিকিৎসক এবং ভয়েস অফ টোব্যাকো ভিকটিমের সক্রিয় সদস্য সোমনাথ সরকার জানাচ্ছেন, ই-সিগারেটের প্রধান উপকরণ নিকোটিন থেকে দ্রুত আসক্তি তৈরি হয়। সিগারেট ছাড়তে চেয়ে যাঁরা এটি ব্যবহার করেন তাঁদের এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা থেকে দেখা দিতে পারে ফুসফুসের বিভিন্ন অসুখ।

তবে ই-সিগারেটের মধ্যে থাকা নিকোটিন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে অনেকদিন থেকেই। প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে সরাসরি নিকোটিন ব্যবহার আদৌ করা যায় কি না? আইন মোতাবেক নিকোটিন ‘শিডিউল কে’ ড্রাগ এবং এর সরাসরি ব্যবহারের মাত্রা ২ থেকে ৪ মিলিগ্রাম। তাও নিকোটিন ছাড়ানোর চিকিৎসাপদ্ধতি হিসেবে লজেন্স অথবা চিউয়িং গামের মধ্যে ওই নির্দিষ্ট মাত্রার নিকোটিন ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু ই-সিগারেটে যেভাবে রাসায়নিক নিকোটিন ব্যবহার করা হয় তা ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া (ডিসিজিআই) দ্বারা অনুমোদিত নয় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মৃত্যুও হতে পারে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা।

বছর দু’য়েক আগে ভারত সরকার চিকিৎসক, বিজ্ঞানী এবং পরিবেশকর্মীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি সব দিক খতিয়ে দেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রককে ই-সিগারেট বন্ধের সুপারিশ করেছিল। প়ঞ্জাব, হরিয়ানা এবং মহারাষ্ট্র সরকার আগেই হুঁকা, ই-সিগারেট ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যুবসমাজের মধ্যে এর চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত অনলাইনেই রমরমিয়ে বিকোচ্ছে ই-সিগারেট। আর তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা।

ক্যানসার চিকিৎসক এবং ভয়েস অফ ক্যানসার ভিকটিমের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য গৌতম মুখোপাধ্যায়ের মতে, ই-সিগারেটের মধ্যে একটা চমকপ্রদ ব্যাপার রয়েছে যা দেখে য়ুবসমাজ সবচেয়ে বেশি করে আকৃষ্ঠ হচ্ছে। কিন্তু এর থেকে ক্ষতি হয়না এই ধারণা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘‘আমরা কখনই কাউকে ই-সিগারেট খেতে বলি না। এর ধোঁয়ায় এমন কিছু উপাদান আছে যেগুলি থেকে ক্যনসার হওয়ার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা রয়েছে।’’

একই মত সোমনাথবাবুরও। তিনি জানাচ্ছেন, বিজ্ঞাপন দেখে মানুষ ভুল বুঝছে। সবচেয়ে বেশি আসক্ত হচ্ছে যুবসমাজ। ধূমপান নিষিদ্ধ এমন ক্লাব অথবা পানশালাতেও ই-সিগারেট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় আর তাতেই এর চাহিদা বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘‘ই-সিগারেট দিয়ে কোনওদিন সিগারেট ছাড়া যায়না। বরং বেশি খরচ করে মানুষ আরও বড় বিপদ ডেকে আনছে। জাপানে একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে দশ গুণ বেশি ক্ষতিকারক। আমরা সিগারেটের পাশাপাশি এর বিরুদ্ধেও সচেতনতা গড়ে তুলতে চাইছি।’’