আমাদের শরীরে বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ, খনিজ ও লবণ রয়েছে। এগুলো বিভিন্ন শারীরবৃত্তিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়। স্নায়ু ও মাংসপেশির কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এদের ইলেকট্রোলাইটস বলা হয়। সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম হল প্রধান ইলেকট্রোলাইটস। যে কোনো কারণে শরীরে এসব উপাদানের পরিমাণ কমে বা বেড়ে গেলে ইলেকট্রোলাইটসের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয় ।
যেকোনো বয়সে এটি হতে পারে। সাধারণত অসুস্থ বয়স্ক, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের বেশি হয়ে থাকে।

ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা আসলে কী?
শরীরে বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইটের পরিমাণ বিভিন্ন রকমের। যেমন রক্তে সোডিয়াম থাকে প্রতি লিটারে ১৩৬-১৪৫ মিলিমোল। এই পরিমাণটি বিভিন্ন কারণে কম বা বেশি হতে পারে। শরীরে বিভিন্ন ইলেকট্রোলাইটের পরিমাণ সামান্য কম বা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। যখন সেটি খুব কম বা খুব বেশি হয়ে যায়, তখন ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। এটি যেকোনো একটি বা কয়েকটি ইলেকট্রোলাইটের ক্ষেত্রে একসঙ্গেও হতে পারে।

কেন হয়?
* ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হলে।
* অধিক বমি হলে।
* অত্যধিক ঘামের ফলে শরীর থেকে প্রচুর তরল বেরিয়ে গেলে।
* অপর্যাপ্ত খাদ্য, ভিটামিনের অভাবে।
* বেশি ডায়েট কন্ট্রোল করলে।
* পরিপাকতন্ত্রের সমস্যার জন্য। যার কারণে গৃহীত খাদ্য থেকে ইলেকট্রোলাইট শোষিত হতে পারে না।
* একধরনের ইলেকট্রোলাইট যুক্ত খাবার বেশি গ্রহণ করলে।
* হরমোন-সংক্রান্ত রোগ, যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাডিসন’স ডিজিজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে।
* কিডনি রোগে।

চিকিৎসা সম্পৃক্ত কারণ
* ল্যাসিকস জাতীয় ওষুধ খেলে। এই জাতীয় ওষুধ শরীর থেকে পানি বের করে দেয়।
* কিছু অ্যান্টিবায়োটিক।
* স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ।
* এ ছাড়া মারাত্মক পানিশূন্যতা এবং শক্-এ চলে যাওয়া রোগীদেরও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা হতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন?
ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার উপসর্গ নির্ভর করে কোন ধরনের ইলেকট্রোলাইট কম বা বেশি হয়েছে তার ওপর। সোডিয়ামের অভাব এবং সালফারের অভাব একই লক্ষণ দিয়ে বোঝা যাবে না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়। যেমন:
* মাংসপেশি কামড়ানো, পেশিতে টান পড়া, পেশির অসাড়তা
* খিঁচুনি
* মাথা ঘোরা, শারীরিক দুর্বলতা
* অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, রক্তচাপের পরিবর্তন
* স্নায়ুতন্ত্রের ও হাড়ের সমস্যা ইত্যাদি।

রোগনির্ণয়ে
সাধারণত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা হয়েছে কি না বা হলেও কোন ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা হয়েছে।

কারা আক্রান্ত বেশি হন
* ঘরের ভেতরে বা বাইরে যাঁরা বেশি গরমে কাজ করেন।
* বয়স্ক ব্যক্তি
* গর্ভবতী নারী
* শিশু-কিশোর
* ক্যানসার রোগী

চিকিৎসা
অল্প পরিমাণ ভারসাম্যহীনতা সাধারণত খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমেই ঠিক করে নেওয়া যায়। যেমন রক্তে যদি পটাশিয়ামের মাত্রা সামান্য কমে যায়, তবে পটাশিয়ামযুক্ত খাবার খেয়ে (যেমন কলা বা ডাবের পানি) সেটা সহজেই পূরণ করা সম্ভব।
যদি কোনো রোগের কারণে বেশি ভারসাম্যহীনতা হয়, তবে সেই রোগের চিকিৎসা করার আগে রোগীকে অবশ্যই দ্রুত ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা শোধরাতে হবে। এ ক্ষেত্রে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। রক্তে স্যালাইনের মাধ্যমে দ্রুত শরীরে ইলেকট্রোলাইট দিতে হবে। এরপর মূল কারণের চিকিৎসা করতে হবে।

প্রতিরোধ
রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সব সময়ই উত্তম। ফলে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা হয়ে হাসপাতালে ছুটোছুটি করার চেয়ে আগে এ-সংক্রান্ত সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
শরীরে পানি ও লবণের অভাব যাতে না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে, বিশেষ করে গরমে। পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণে প্রচুর পরিমাণে পানি, স্যালাইন, লেবুর শরবত, ফলের রস ইত্যাদি বেশ সহায়ক। গরমে খুব বেশি চা বা কফি পান না করে স্বাভাবিক বা ঠান্ডা পানীয় বেশি পান করা উচিত।
কোনো রোগ বা কিছুর অভাবে ভারসাম্যহীনতা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
লেখক: ডা. তানভীর আহমেদ (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, কল্যাণপুর, ঢাকা)