কাশি নিয়ে যত কথা

0

ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান// বারবার কাশি হচ্ছে, রাতে বেশি কাশি, কাশতে কাশতে কখনও বমি হয়ে যাচ্ছে, কখনও বা কাশির সঙ্গে গা-হাত-পায়ে ব্যথা। এমনটাতো মাঝে মাঝেই হতে পারে। লাগাতার সাত-আট দিন কাশি হলে চিন্তা হয় বৈকি!

আমরা কেন কাশি
শরীরকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অনেকগুলো ব্যবস্থা আছে- সে সব ব্যবস্থারই একটা হল কাশি। কাশি হলে বুঝতে হয় শরীর সমস্যায় পড়েছে, সম্ভবত সে সমস্যা শ্বাসনালীতে। শ্বাসনালীকে পরিষ্কার করার জন্য আমরা কাশি।

কাশির সময় কী হয়
নাক ও মুখের পেছনদিকটা এক, সেখান থেকে দুটো নালী আলাদা হয়ে যায় শ্বাসনালী ও খাদ্যনালী। খাবার খাওয়ার সময় যাতে শ্বাসনালীতে খাবার ঢুকে না যায় তাই শ্বাসনালীর শুরুতে একটা দরজা থাকে। কাশির সময় সেই দরজা বন্ধ হয়, ফলে বুকে ফুসফুসের ভেতরের চাপ বাড়ে। এই বাড়তি চাপে হঠাৎ দরজা খুলে গিয়ে ফুসফুসের বাতাস তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে আসে। তাড়াতাড়ি বাতাস বেরোনোর জন্য কাশির আওয়াজ হয়।

কফ কীভাবে বেরোয়
কফ আসলে আমাদের শ্বাসনালীর রস। স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাসনালীকে ভিজে রাখা এর কাজ। মেট্রো স্টেশনে বা বড় শপিং মলে আমরা যেমন চলন্ত সিঁড়ি দেখি, তেমনি এক চলন্ত সিঁড়ি আছে আমাদের শ্বাসনালীতে।

অণুবীক্ষণের নিচে যদি দেখি তাহলে দেখা যাবে শ্বাসনালীর ভেতরের আবরণী স্তম্ভ বা থামের আকারের কোষ দিয়ে তৈরি, আর সেই কোষগুলোর ওপরে আছে রোয়া বা সিলিয়া। শ্বাসনালীতে রস বা শ্লেস্মা দুটো স্তরে থাকে- ওপরে তিন ভাগ ঘন জেলির মতো জেল আর নিচে সাত ভাগ খুব পাতলা সল। সলস্তরে রোয়াগুলো ডুবে থাকে আর খাড়া অবস্থায় রোয়ার ডগাগুলো ছুঁয়ে থাকে জেলস্তরকে। রোয়াগুলো যখন কোনো একদিকে হেলে যায় তখন সেদিকে জেলস্তরকে ঠেলে দেয়। শ্বাসনালীর রোয়াগুলো একদিকেই হেলতে পারে, ভেতর থেকে বাইরের দিকে। এর ফলে জেলস্তর ফিতার মতো ভেতর থেকে বাইরের দিকে চলে আসে। এই জেলস্তরেই ধুলা আর জীবাণুগুলো আটকে গিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

এই যে চলন্ত সিঁড়ির কথা বললাম, তাকে সচল রাখতে দিনে মোটামুটি ১০০ মিলিলিটার রস দরকার। আগেই বলেছি, জেল ও সলস্তরের স্বাভাবিক অনুপাত ৩:৭। সলের অনুপাত বেড়ে গেলে রোয়াগুলো ভালোভাবে কাজ করতে পারে। ১০০ মিলিলিটার অবধি রস বেরোলে আমরা বুঝতে পারি না, অজান্তেই গিলে ফেলি। ১০০ মিলিলিটারের বেশি হলে কফ হয়েছে বলে আমরা বুঝি। কফ হল কাশি হওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক, অর্থাৎ কফ থাকলে কাশি হয়।

কাশি কোনো রোগ নয়
কাশি কোনো রোগ নয়, অনেক রোগের একটা সাধারণ উপসর্গ হল কাশি। অনেক রোগে কাশি হয়, যেমন-
* শ্বাসতন্ত্রের জীবাণু সংক্রমণ- নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস ইত্যাদি।
* শ্বাসতন্ত্রের এলার্জি- যেমন হাঁপানি।
* শ্বাসতন্ত্রের ক্যান্সারে।
* শ্বাসনালীতে ধোঁয়া, ধুলা ঢুকলে, ধূমপানে, ধূলিবহুল কর্ম পরিবেশে।

কাজ থেকে কাশি
যে সব কাজের পরিবেশ ধূলিবহুল, সেখানে যারা কাজ করেন, তাদের শ্বাসতন্ত্রে ধুলা ঢোকে। বড় ধূলি কণাগুলো নাকের লোমে আটকা পড়ে, তার চেয়ে ছোট কিছু কণাকে শ্বাসনালীর রোয়া কফের সঙ্গে বের করে দেয়, একদম ছোট কণাগুলো কিন্তু ফুসফুসের হাওয়ার থলিতে ঢুকে ঘায়ের সৃষ্টি করে। এই রোগগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় ডাস্ট ডিজিজেস বা অকুপেশনাল ডাস্ট ডিজিজেস।

পোশাক কারখানার একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় বাতাস চলাচল করতে না পারায় এবং অক্সিজেনের অপর্যাপ্ততায় যক্ষ্মাসহ নিঃশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়।
* কয়লাখনির শ্রমিকদের হয় এন্থাকোসিস।
* পাথরভাঙ্গার কাজে সিলিকোসিস।
* এসবেস্টস শিল্পে (cement industry) এসবেস্টোসিস।
* চিনি শিল্পে ব্যাগাসোসিস।
* কাপড় কলে বিসিনোসিস (বাদামি ফুসফুস)। তুলার ধুনা এবং অন্যান্য কণা স্পিনিং শ্রমিকদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের রোগ।
* পাট শিল্পে যে রোগ হয় তার এখনও নাম দেয়া হয়নি।

কাশি হলে কী করবেন
* প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন, এতে কফ পাতলা হবে, কফ বের করার চলন্ত সিঁড়ি ভালোভাবে কাজ করতে পারবে।
* গরম পানির ভাঁপ নিন। ভাঁপ শ্বাসনালীতে গিয়ে পানিতে পরিণত হবে, কফ পাতলা হবে।
* শুকনো কাশিতে গলা খুসখুস করলে হাল্কা গরম পানিতে একটু নুন দিয়ে কুলকুচি করুন। মুখে সাধারণ যে কোনো লজেন্স, লবঙ্গ বা আদা রাখলেও একটু আরাম পাওয়া যাবে।
কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে
* কাশির সঙ্গে হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট হলে।
* কফের সঙ্গে রক্ত পড়লে।
* কাশতে কাশতে শরীর নীল হয়ে গেলে।
* কথা বলতে কষ্ট হলে।
* দুধের বাচ্চা দুধ টেনে খেতে না পারলে।
* দুই সপ্তাহের বেশি কাশি হলে।
আমাদের দেশে প্রচুর যক্ষ্মা রোগী, তাই কোনো রোগীর কাশি দুই সপ্তাহের বেশি হলে,কফ পরীক্ষা করে দেখা উচিত।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, বক্ষব্যাধি, এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
mohammadrahmandr @ gmail.com