আবার মা-বাবার ঝগড়া…

0

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, মনোমালিন্য হতেই পারে। কিন্তু কতটুকু সন্তানের সামনে প্রকাশ করবেন, তা ভাবার বিষয়। কেননা, মা-বাবার ঝগড়া শিশুর মনোজগতে আলোড়ন ফেলে…

মৃদুলা (ছদ্মনাম) মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে আসে অদ্ভুত এক সমস্যা নিয়ে। ৩০ বছরের জীবন পার করার পর তার মনে হয় বন্ধুমহল, কর্মস্থল, পরিবার এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক—কোথাও যেন সে ঠিকমতো খাপ খাওয়াতে বা স্থিতু হতে পারছে না। সবকিছুতে একধরনের অবিশ্বাস, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নিজের ও অন্যের প্রতি আস্থাহীনতা ক্রমশ তাকে বিচ্ছিন্ন ও অসুখী করে তুলছে। মৃদুলার এই সমস্যার ভেতরটা জানতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ যখন তার শৈশবে চলে যান, তখন জানা যায়, তার ছেলেবেলাটা আর দশটা বাচ্চার মতো খুব একটা ঝলমলে, আনন্দপূর্ণ বা নিরুদ্বেগ ছিল না। বরং প্রতিনিয়ত বাবা-মায়ের তুমুল দ্বন্দ্ব, ঝগড়া, ভালোবাসাহীনতায় মৃদুলার শৈশব কেটেছে আতঙ্কে, নিরাপত্তাহীনতায় এবং বিষণ্ণতায়।
প্রশ্ন আসে, বাবা-মায়ের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক আসলে কীভাবে এবং কতখানি প্রভাব ফেলে শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশে? আর এ প্রভাব পরবর্তী জীবনে তার কতদূর পর্যন্ত বহন করতে হয়?
আমাদের মানসিক গঠনের ভীতি মূলত তৈরি হয় জন্ম থেকে শুরু করে কৈশোরকাল পর্যন্ত। জন্মগতভাবে পাওয়া চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছেলেবেলার নানান অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়ে বড় হওয়ার পরে একধরনের সম্পূর্ণ মানসিক কাঠামো তৈরি হয়। বাবা-মায়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা তাকে যতটুকু শেখায়, তার চেয়ে সে অনেক বেশি ‘দেখে’ শেখে। তাদের আচার-আচরণ, জীবন যাপন, ভাষার ব্যবহার—অনেক কিছুই শিশুরা বড়দের অজান্তে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্য নিয়ে নেয়।
সুতরাং বাবা-মায়ের খারাপ সম্পর্কের প্রভাব শুধু সন্তানের শৈশবেই আটকে থাকে না, বরং এর জের তাকে টানতে হয় সারা জীবনের পথচলায়, তার সামগ্রিক জীবনবোধে, এমনকি সম্পর্ক তৈরিতেও।

মা–বাবার বৈরী সম্পর্ক সন্তানদের মধ্যে বিষণ্ণতা তৈরি করতে পারেঅনিরাপত্তাবোধ
শিশুর ছোট্ট জগতের মোটামুটি পুরোটাই জুড়ে থাকে বাবা-মা। তার ভালোমন্দ নির্ভর করছে বাবা-মায়ের ভালো থাকার ওপর—এ সত্যটা তার মন অনেক আগেই জেনে যায়। বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ ও মাধুর্যমণ্ডিত সম্পর্ক তাকে যে একধরনের নিরাপত্তাবোধ দেয়, সেটা তার আত্মবিশ্বাস তৈরির জন্য অপরিহার্য। পরস্পরকে তীব্র আক্রমণ, কথায় কথায় ছেড়ে যাওয়ার হুমকি ইত্যাদি বাচ্চাদের মধ্যে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।

নেতিবাচক আচরণ শেখা
অনেক সময়ই ঝগড়ার সময় মা-বাবাদের মধ্যে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, গালিগালাজ, ভাঙচুর ও শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটে থাকে। বাচ্চাদের মনে ভীতি সঞ্চারের পাশাপাশি এসব নেতিবাচক আচরণ, শব্দ, ভাষা শিশুরা শেখে, যা বড় হওয়ার পর নানাভাবে প্রকাশিত হয়।

হীনম্মন্যতাবোধ ও বিষণ্নতাবোধের জন্ম

মা–বাবার বৈরী সম্পর্ক সন্তানদের মধ্যে একধরনের হীনম্মন্যতা ও বিষণ্ণতা তৈরি করতে পারে, যা খালি চোখে সেভাবে বোঝা নাও যেতে পারে। অল্পতেই রেগে যাওয়া, পড়াশোনায় অমনোযোগ, অবাধ্যতা, সহজে মিশতে না পারা নানাভাবেই এর প্রকাশ হতে পারে।

সম্পর্কে আস্থাহীনতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ:
মা–বাবার পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসার সম্পর্ক থেকেই শিশু বাইরের জগতের নানা সম্পর্ক বুঝতে শেখে। অবিশ্বাস ও ঘৃণার মধ্যে বেড়ে ওঠা সন্তানের চারপাশ সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সম্পর্ক তৈরিতে এবং পরবর্তী সময়ে নিজের দাম্পত্যজীবনে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে।

বাবা-মায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা
অনেক সময়ই দেখা যায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলে, জীবনসঙ্গী সম্পর্কে ‘খারাপ’ ধারণা সন্তানের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করা হয়। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, একজন সন্তানের উৎস (অরিজিন) ও অস্তিত্বের ভিত্তি কিন্তু বাবা-মা দুজনেই। সুতরাং যেকোনো একজনের প্রতি অশ্রদ্ধা শিশুর মনে গভীর সংকট তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মায়েদের পরস্পরের প্রতি ক্ষোভ সন্তানদের ওপর দিয়ে মিটিয়ে থাকে। যেমন—গায়ে হাত তোলা, তীব্র ভাষায় আক্রমণ (‘তুমি তো তোমার বাবার মতোই স্বার্থপর’) ইত্যাদি আচরণ শুধু সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করবে না, বরং তার আত্মমর্যাদা তৈরিতে বাধা দেবে।

মাদকাসক্তি ও অন্যান্য সমস্যা
দেখা যায়, পরিবারের মধ্যে যদি যথেষ্ট আনন্দ ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ না থাকে, সে ক্ষেত্রে কৈশোরের টালমাটাল সময়ে বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। মাদকাসক্তি, ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব (পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার), বিষণ্ণতা, কোনো কিছুতে খাপ না খাওয়াতে পারা (অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার), অবাধ্যতা ইত্যাদির মূল কারণও অনেক সময় থাকে বাবা-মায়ের অসুন্দর ও অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক।
দাম্পত্য সম্পর্কটা এমনই যে এর মধ্যে দ্বন্দ্ব, মতবিরোধ ও ক্ষেত্রবিশেষে কলহ থাকতেই পারে। কোনো ক্ষেত্রে বিষয়টা হয়তো নেহাতই সাময়িক এবং একধরনের বাহ্যিক প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। বাবা-মায়ের চরম দ্বন্দ্বের মূল কারণটা অনেক সময় তাঁদের ভালোবাসার অধিকারবোধ থেকেও হতে পারে। সেই বোধ শিশুদের স্বাভাবিকভাবেই থাকে না। সুতরাং আপনার সন্তান আপনাদের মধ্যে যা দেখছে বা শুনছে, তাই সত্যি বলে ধরে নিচ্ছে। নিজেদের মধ্যে তর্ক হলেও কিছু জিনিস খেয়াল রাখবেন—

যা করবেন না
 সন্তানের সামনে পারতপক্ষে ঝগড়া না করা।
 তর্কের সময় কখনোই সন্তানের সামনে পরস্পরের প্রতি খারাপ মন্তব্য, অশ্রদ্ধাপূর্ণ শব্দ, ভাষা ব্যবহার করবেন না।
 ঝগড়ার সময় আতঙ্কপূর্ণ পরিবেশ যেমন—ভাঙচুর করা, গায়ে হাত তোলা, হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
 নিজেদের সম্পর্ক যাই থাকুক, সন্তানকে বাবা বা মা সম্পর্কে খারাপ ধারণা দেবেন না।
 পরস্পরের প্রতি রাগ বা ক্ষোভ সন্তানদের মধ্য দিয়ে মেটানোর চেষ্টা করবেন না।
 দাম্পত্য কলহের কারণ তৃতীয় কোনো ব্যক্তি হলে সেটা সন্তানের সামনে আলোচনা থেকে বিরত থাকুন।
 অভিযোগপূর্ণ শব্দ ব্যবহার না করার চেষ্টা করুন। (যেমন—তুমি কেন এটা করেছ, না বলে বলুন—‘তোমার এ আচরণ আমি গ্রহণ করতে পারছি না’)।

কী করবেন?
 পরস্পরের প্রতি যেকোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ সন্তানের অনুপস্থিতিতে (যেমন স্কুলে থাকলে) আলোচনা করুন।
 নিজেদের রাগ প্রশমিত হলে সন্তানের সামনে ‘সরি’ বলুন।
 নিজেদের সম্পর্ক যাই থাকুক, বাবা-মা সম্পর্ককে ইতিবাচক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করুন। মানুষের অনেক সীমাবদ্ধতা ও নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য থাকলেও সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের কারও ভালোবাসারই যে খাদ থাকে না, সে ধারণা দিন।
লেখক: মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট