শহরে চলছে গানের বড় উৎসব। মন চাইল স্বামীর সঙ্গে একটু গান শুনতে যেতে। স্বামীর সময়ের অভাবে এটা না হয় হলোই না। আবার শীত শীত কোনো সন্ধ্যায় ইচ্ছা হলো কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সঙ্গীর সঙ্গে টুকটাক রোমান্টিক আলাপ করা। মাঝেমধ্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে কোথাও হারিয়ে যেতেও মন চায়। কিন্তু এই ইচ্ছেগুলো মনেই থেকে যায়। স্বামীর হাতে তো সেই সময় নেই। স্ত্রীর মন তখন খুঁজে ফেরে নতুন কোনো বন্ধুকে। ফেসবুক, টুইটার বা ইনস্টাগ্রামের বন্ধুরা তখন জায়গা করে নেয় সেই শূন্যস্থান পূরণে।
পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতিদিনের ব্যস্ততা। এই ব্যস্ততা কেড়ে নিচ্ছে মনের ছোট ছোট আবেগগুলোকে। সঙ্গীকে সময় না দেওয়ায় বাষ্প জমতে থাকে মনে। সেটা কখন অভিমান হয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না। দাম্পত্যে এই সমস্যা বেশি হয়। দেখা যায় স্বামী হয়তো খুব ব্যস্ত, স্ত্রীকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় তাঁর নেই। তিনি যে ইচ্ছা করে কাজটি করেন, তা-ও নয়। নাগরিক জীবনে নানা রকম চাপের কারণে তিনি সময় করে উঠতে পারেন না। আর যখন হয়তো সময় পান, খেয়ালই থাকে না আলাদা করে বউকে সময় দিতে হবে। শুধু গৃহিণী নয়, অনেক কর্মজীবী স্ত্রীর ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে।
স্ত্রীর মনে জমতে জমতে অভিমানের পাহাড় হয়ে যায়। স্বামী যদি বুঝতে না পারেন বিষয়টি, তবে সেটা গুরুতর হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, এই সময়ে স্ত্রী নিজের সময় কাটাতে বা নিজের মনের কথা বলার জন্য নতুন কোনো বন্ধু খোঁজেন।
আর আজকাল তো ১৫-২০ বছর পরও পুরোনো দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর খোঁজও মিলছে ফেসবুকে। পুরোনো বন্ধু মানেই তো সোনালি সেই সব দিন। সুখময় স্মৃতি। সোনালি ডানার চিলের পাখায় ভর করে সেই আনন্দময় দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া। আবার অনেক ক্ষেত্রে মিলে যায় নতুন বন্ধুও, যার সঙ্গে হয়তো মানসিকতাটার মিল থাকে। আধুনিক জীবনপ্রবাহে এই বাস্তবতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সমস্যা অন্য জায়গায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই বন্ধুতা অনেকের দৈনন্দিন জীবনে সৃষ্টি করছে সংকট। ফেসবুকের বন্ধু অনেক সময় হয়ে পড়ছে সংসারের সঙ্গী কিংবা বর্তমান ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর চোখের বালি।
ফেসবুকে আবার প্রাণও পাচ্ছে অনেকের পুরোনো প্রেম। মেয়েটি কৈশোরে যে ছেলেটির ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করেছিল, বিবাহিত জীবনে সেই প্রেম হয়তো আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। সংসার হয়ে উঠল বিষময়।
আরেকটি ঘটনা। স্বামী অতিরিক্ত ব্যস্ত। এক সন্তানের মাকে তিনি নিজেই ফেসবুক ব্যবহারে উৎসাহ জুগিয়েছেন। স্ত্রী বেশ সক্রিয় হয়ে উঠলেন। স্ত্রী যেন ফিরে যান তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে। সবাইকে নিয়ে একটা গ্রুপ করেছেন। দল বেঁধে সবাই একে অপরের বাড়িতে যাচ্ছেন। ব্যস্ত স্বামী এসব মেনে নিতে পারছেন না কিছুতেই। আবার সময়ও দিতে পারেন না।
এমন সব ঘটনা চারপাশে বিরল নয়। সংখ্যাটাও দিনে দিনে বাড়ছে।

সম্পর্কটা থাক সতেজ
দম্পতি; হোক সে নতুন বা পুরোনো, সম্পর্ক হতে হবে সব সময়ই সতেজ। স্নিগ্ধতায় ভরা। মধুময়। স্বামী কাজে ব্যস্ত। দৈনিক আট ঘণ্টা অফিস শেষে বাসায় পৌঁছাতে আরও দেরি। স্ত্রী সারা দিন বাসায় একা। টিভি দেখা, ম্যাগাজিন পড়া, ফোনে কিছুটা সময় কাটানো। তার পরও কিছু করার নেই। সবাই ব্যস্ত। এত ব্যস্ততার মধ্যে একাকিত্ব কাটানোর জন্য আপনি ফেসবুককে সঙ্গী করে নিলেন। ক্রমেই আপনার একাকিত্ব কেটে যেতে থাকল। স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, চ্যাটিং করছেন, অন্যের স্ট্যাটাস ও ছবিতে লাইক করছেন, কমেন্টস করছেন—মনের ভাব বিনিময় হচ্ছে। বন্ধুত্ব গাঢ় হতে থাকল। এরপর সম্পর্ক শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ থাকল না। ক্যাফে, শপিং মলে আড্ডাও চলে। এখন স্বামীর অনুপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ করেন না, কিন্তু একটা সময় যদি স্বামীর মনে খটকা লাগে বা নিজেই যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন, তবে এই নতুন সম্পর্কের কী নাম দেবেন?
এ ধরনের সমস্যায় কি বৈবাহিক সম্পর্কে চিড় ধরবে আর নতুন সম্পর্ক অটল হয়ে থাকবে? অযথা সন্দেহের আবর্তে স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব কি বাড়তেই থাকবে?

দুজনে মিলে যা করতে পারেন
স্ত্রী যখন তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যেতে চান, তখন তাঁকে বাধা দেওয়ার কিছু নেই। এই স্বাধীনতা তাঁকে দিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় স্বামী যদি একটু সময় বের করে স্ত্রীকে দেন। সময় অল্প হলেও আন্তরিকতা থাকলে বা কোয়ালিটি সময় দিলে স্ত্রীর মনে স্বামীকে নিয়ে আর খারাপ লাগা থাকবে না। কাজের ফাঁকে ছুটি নিয়ে কোথাও একবেলার জন্য ঘুরে আসতে পারেন। সব সময় যে কারণ ধরেই যেতে হবে এমন নয়, অকারণ পাগলামিতে অভিমানের বরফ গলে যায়।
আর ব্যস্ততার মাঝেও ফেসবুকে নিজেরা চ্যাটিং করতে পারেন। নিজেদেরও সময় দিন। ঘরের মধ্যে নিত্যদিনের সংসারসঙ্গীর সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের খানিক সময়ের ভাববিনিময় আরও প্রাণময় করবে দুজনকে।

সচেতন থাকুন
নিজের মনের অগোচরে যদি কোনো নতুন ‘বিশেষ’ সম্পর্ক উঁকি দেয় বা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে প্রথমেই তা সামলে নিন। ফেসবুকসহ অন্য সব যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম প্রতারণা বাড়ছেই।
ফেসবুকে অনৈতিক নানা প্রস্তাবও পেতে পারেন বন্ধুদের কাছ থেকে। ইদানীং দেশেও এ চক্র সক্রিয়। মানবমনের আকাঙ্ক্ষা বড় বিচিত্র। মনে রাখতে হবে, এই চক্রগুলো সক্রিয় আমাদের নানা গোপন আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরেই। এসব বিষয় সব সময় মাথায় রাখতে হবে।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও আন্তরিক হতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে । ক্ষণিকের ভুলে যেন সারা জীবন কষ্ট পোহাতে না হয়। স্বামী-স্ত্রী পরস্পর খোলাখুলি আলাপ করতে পারেন।

যা কখনোই করবেন না
সংসার মধুময় বন্ধন। এ ধরনের ফেসবুক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নির্মল বন্ধুত্বের সীমা কখনোই যেন অতিক্রম না করে।
জীবন চলার পথে পুরোনো কোনো ঘনিষ্ঠতম বন্ধুর সঙ্গে আবার আলাপ-পরিচয় হতেই পারে। এ নিয়ে আবেগের বাড়াবাড়িকে প্রশ্রয় দেবেন না। সহজভাবে নিন। ওই বন্ধুর কথা আপনার জীবনসঙ্গীকেও জানান। আড়াল করার দরকার নেই। বন্ধুকে বন্ধু হিসেবেই রাখুন।
ফেসবুক হোক আর ই-মেইলেই হোক, কোনো ধরনের বিব্রতকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে দ্রুত সঙ্গীকে জানান। দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিন কী করবেন।
আপত্তিকর ছবিসংবলিত কোনো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলে সেটা এড়িয়ে যান। এটাই সর্বোত্তম পথ।
যেসব একাউন্ট থেকে আপত্তিকর ছবি, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো হয়, সেগুলো পরিহার করুন।

লেখক: সুলতানা আলগিন
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সুত্র: প্রথম আলো