ঈদের খাবারের হিসেব নিকেষ

0

পোলাও-পায়েস ছাড়া ঈদ হয় নাকি? আর কোরবানির ঈদ মানে এইসঙ্গে গোশত। খাওয়ারও থাকে না কোনো হিসাব-নিকাশ। তবে, হুঁশ রেখে না খেলে কিন্তু বিপত্তি ঘটতে পারে। তাই ঈদে খাব, কিন্তু হিসাব করে। ঈদের খাওয়া নানা পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ডা. এ এম এম এ রায়হান।
ঈদে ছোটদের আনন্দ সবচেয়ে বেশি। তাদের বয়সটাই এমন। খাবারও ওরা খেতে পারে বেশি বেশি এবং সবকিছুই। এ বয়সে অসুখবিসুখ তেমন থাকে না বলে ঈদে এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না_ এসবের বালাই ওদের নেই।

১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে
এই বয়সে সবার হজমশক্তি ভালো থাকে এবং সাধারণত এই বয়সী মানুষ ডায়াবেটিসের মতো রোগ, হাইপারটেনশন থেকে মুক্ত থাকে। তাই এই বয়সে প্রোটিন বা আমিষ, কার্বোহাইড্রেড বা শর্করা এবং ফ্যাট বা চর্বি ইত্যাদি সহজে হজম হয়। তাই তারা ঈদের দিনের সব ধরনের রান্নাই খেতে পারবে।
– অনেকে ভাবেন, গরুর মাংস খাওয়া ভালো নয়। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। গরুর মাংস খুব উচ্চমানের আমিষ এবং এতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের অ্যামাইনো এসিড থাকে। এই বয়সে গরুর মাংস খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং উপকারী। তবে অতিরিক্ত খাওয়ার দরকার নেই এবং অবশ্যই উত্তমরূপে রান্না করা হতে হবে। কাবাব বা পোড়ানো মাংস না খাওয়াই ভালো।
– এই ঈদে মাংস বেশি খাওয়া হয় বলে সমানতালে সবজি, শাক, ডাল ইত্যাদি খাওয়া হয় না। তাই ঈদের সময় কোষ্ঠকাঠিন্য, এমনকি পায়ুপথে ব্যথা বা রক্তপাত পর্যন্ত হতে পারে। তাই কোরবানি ঈদে মাংস খাওয়ার পাশাপাশি পেঁপে, গাজর ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা সবজির একটি আইটেম রাখুন। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পানি ও ফলের রস খান। যাঁদের আগে থেকেই অ্যানাল ফিশার বা পাইলসের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা মাংস পরিমিত পরিমাণে খান। সঙ্গে সকাল ও রাতে ইসবগুলের ভুসি এবং তরল খাবার খান।
– যাঁদের পেপটিক আলসারের সমস্যা রয়েছে, তাঁরা চর্বিযুক্ত বা অতিরিক্ত ঝাল দিয়ে রান্না করা খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে দুবেলা অ্যান্টি-আলসারেন্ট কোনো ওষুধ, যেমন_রেনিটিডিন, প্যান্টোপ্রাজল, ইসমিপ্রাজল ইত্যাদির যেকোনো একটি খেয়ে নিন।

৩৫ থেকে ৫৫ বছরের বয়সীদের ক্ষেত্রে
এ সময় স্বাভাবিকভাবেই হজমশক্তি আগের তুলনায় হ্রাস পায় এবং খাওয়াদাওয়া নিয়মিত ও পরিমিত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের অসুখ, যেমন_হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, হাইপারকোলেস্টেরিমিয়া (কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া), ওবেসিটি বা মুটিয়ে যাওয়া দেখা দেয়। তবে এ বয়স ছাড়াও যদি অন্যান্য বয়সেও নিচের অসুখগুলো থাকে, সে ক্ষেত্রে পরামর্শগুলো মেনে চলুন।
উচ্চ রক্তচাপ থাকলে
যাঁরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ খান, তাঁদের অনেকেই মনে করেন, কোরবানির সময় গরু বা খাসির মাংস খেলেই প্রেসার বেড়ে যাবে। এ ধারণা মোটেও ঠিক নয়। তারা চর্বি ছাড়া মাংস খেতে পারবেন এবং এতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রেসার বেড়ে যাবে না। তবে কখনোই অতিরিক্ত খাওয়া চলবে না এবং চর্বি এড়িয়ে চলতে হবে।
– ঈদের ব্যস্ততায় কিন্তু প্রেসারের ওষুধ খেতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন, রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত খেতে হয়। বাদ দিলে বরং ক্ষতি বেশি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
– যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপের কারণে কিডনি সমস্যা তৈরি হয়েছে, তারা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

ডায়াবেটিস থাকলে
ডায়াবেটিসের রোগীদের মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য, যেমন_পায়েস, সেমাই ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উচিত। নিতান্তই খেতে ইচ্ছা হলে চিনির পরিবর্তে সুগার-ফ্রি ট্যাবলেট এবং ফ্যাট-ফ্রি দুধ দিয়ে তৈরি করা খাবার খান।
– পোলাও-বিরিয়ানি কম খান কিংবা এর পরিবর্তে ভাত খাওয়ার চেষ্টা করুন।
– গরুর মাংস খেতে পারবেন। তবে খাসির মাংস, চর্বিযুক্ত মাংস এবং মগজ বাদ দিন।
– যাঁদের দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ ব্লাড সুগারের জন্য ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি হয়েছে, তাঁরা মাংস খাবেন না।
– ঈদের ব্যস্ততার মধ্যে ডায়াবেটিসের ওষুধ খেতে কিংবা ইনসুলিন নিতে ভুলবেন না।
– যদি কোনো বেলায় খাওয়া বেশি হয়ে যায় কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় দাওয়াত থাকে, তাহলে ওষুধের ডোজ কিছুটা এবং ইনসুলিন দুই ইউনিট বাড়িয়ে নিন। তবে ঈদের আগেই এ ব্যাপারে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।

হার্টের সমস্যা থাকলে
যাঁরা হার্টের সমস্যাজনিত বুকের ব্যথায় ভুগছেন কিংবা আগে যাঁদের মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (হার্টঅ্যাটাক) হয়েছে, তাঁরা ঈদে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকবেন।
– খাসির মাংস, চর্বি-জাতীয় ও তৈলাক্ত খাবার একেবারেই খাবেন না।
– গরুর মাংস (চর্বি ছাড়া) খেতে পারবেন, তবে অতিরিক্ত পরিমাণে নয়।
– সেমাই, পায়েস ইত্যাদি মিষ্টি-জাতীয় খাবার খুব কম খান। কারণ অতিরিক্ত গ্লুকোজ চর্বি হিসেবেও জমা হয়।
– যাঁদের এনজিওগ্রাম, পিসিআই বা বাইপাস সার্জারি হয়েছে, তাঁরা ঈদের রকমারি খাবার থেকে দূরে থাকলেই ভালো করবেন। তবে কোরবানির মাংস একেবারেই খাবেন না, তা নয়। ভাত দিয়ে মাংসের তরকারি খান। অনেকে ভাবেন, হার্টের অপারেশন হলে মসলা ছাড়া মাংস খেতে হবে। তা কিন্তু নয়। মুখরোচক করেই খান, কিন্তু অল্প খান।

কিডনির সমস্যা থাকলে
যাঁদের কিডনি সমস্যা আছে, তাঁদের নিয়ন্ত্রিত প্রোটিন খেতে হয়। তাঁরা মাংস না খেলেই ভালো, খেলেও দিনে দুই টুকরার বেশি নয়। ক্রনিক কিডনি ডিজিজের জন্য যারা ডায়ালাইসিস করান, তাঁরা প্রোটিন খেতে পারবেন এবং তাঁদের ক্ষেত্রে গরুর মাংস খাওয়ার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
– যাঁরা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন, তাঁরা কোরবানির মাংস খেতে পারবেন।

মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকলে
যাঁরা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মোটা তাঁরা সব ধরনের খাবার কম খাবেন_এটি তো সব সময়ই সত্যি। কিন্তু যাঁরা অতিরিক্ত মোটা তাঁরা যে ঈদের খাবার থেকে একেবারেই নিজেকে বঞ্চিত করবেন, তা ঠিক নয়। যাঁরা মোটা কিন্তু হার্টের বা কিডনির কোনোরূপ সমস্যায় ভুগছেন না, তাঁরা অন্য সময় ডায়েটিং করলেও ঈদের মাংসের আইটেমগুলো খেতে পারেন। তবে দাওয়াত খাওয়ার আগে ওরলিস্ট্যাট জাতীয় ওষুধ খান, এতে চর্বির শোষণ হবে না। ফলে খাদ্যের চর্বি শরীরে সঞ্চিত হবে না। এতে মলের সঙ্গে কিছুটা চর্বি যেতে পারে, তবে তাতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। খাওয়ার পর টক দই খান। খাবারের সঙ্গে সালাদও খান।

আইবিএস থাকলে
যাঁদের ইরিটেবল বাওল সিনড্রোম বা আইবিএস রয়েছে, তাঁদের দুধের তৈরি বিভিন্ন মিষ্টদ্রব্য না খাওয়াই ভালো। খাবারের সঙ্গে বোরহানি বা টক দই খাবেন। মাংস পরিমিত খান। কারণ কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগতে পারেন। ওষুধ খেতে ভুলবেন না।

প্রেগন্যান্সিতে বা গর্ভাবস্থায়
অনেকে ভাবেন, গর্ভাবস্থায় গরুর মাংস খাওয়া যায় না। এটা ঠিক নয়। গরুর মাংসে প্রোটিন থাকে, যা গর্ভাবস্থায় নারীদের প্রোটিনের চাহিদা মেটায়। তবে এ সময় মহিলাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকে, যা মাংস বেশি খাওয়ার পর আরো বেড়ে যেতে পারে। তাই ঈদের দিন সকালে এবং আগের দিন রাতে ইসবগুলের ভুসির শরবত খান।

দাঁতের সমস্যা থাকলে
যাঁদের দাঁতের সমস্যা রয়েছে অথবা দাঁতে ফাঁক রয়েছে, তাঁরা মাংস খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। দাঁতের ফাঁকে আটকানো মাংস থেকে মুখে দুর্গন্ধ, মাড়ির ইনফেকশন বা মাড়ি ফোলা, দাঁত ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। তাই দাঁতের কোনো সমস্যা থাকলে ঈদের আগেই ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হোন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিন। ডেন্টাল ফ্লস কিনে রাখুন এবং মাংস খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করে ফেলুন ও ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করুন। যাঁদের দাঁতে ক্যাপ লাগানো আছে, তাঁরা মাংসের হাড় খাওয়ার সময় সতর্ক থাকুন।

৫৫ ও তদূর্ধ্ব
অন্য কোনো অসুস্থতা না থাকলে এবং দাঁতের কোনো রকম সমস্যা না থাকলে কোরবানির মাংস অবশ্যই খেতে পারবেন। যাঁদের অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা ধমনিতে চর্বি জমার প্রবণতা আছে এবং আগে স্ট্রোক হয়েছে, তাঁদের কোরবানির মাংস, মগজ, বিরিয়ানি, পোলাও, পায়েস, সেমাই ইত্যাদি পরিহার করাই ভালো।
– খাবারের সঙ্গে সালাদের আইটেম রাখুন। এতে পেট অনেকখানি ভরে যায় এবং অন্যান্য খাবার বেশি খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়।
– খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পানি খাবেন না। কারণ এতে মাংস ও ফ্যাট পরিপাক করার এনজাইম যেমন পেপসিন, ট্রিপসিন, লাইপেজ ইত্যাদি পাতলা বা উরষঁঃব হয়ে যায়। ফলে হজম ভালো হয় না। বরং যাঁরা মোটা বা কম খেতে চান, তাঁরা খাবারের আধঘণ্টা আগে এক-দেড় গ্লাস পানি খান। এতে পেট ভরা ভরা লাগবে এবং খেতে বসে কম খেতে পারবেন।
– ঈদের রাতে দাওয়াত থাকলে ভারী খাবার খাওয়ার পর অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা পর ঘুমাতে যাবেন। কখনোই ভরা পেটে ঘুমিয়ে পড়বেন না।
– মাংস ভালো করে চিবিয়ে খাবেন। গোগ্রাসে গরুর মাংস খাবেন না।

গরুর মাংসে অ্যালার্জি থাকলে
অনেকের গরুর মাংসে অ্যালার্জি থাকে এবং খেলে গা চুলকায়, লাল লাল ছোপ হয় এবং ফুলে যায়। তাঁরা ভাবেন, কোরবানির পশুর মাংস খেলে বুঝি এরূপ হবে না। এটা ঠিক নয়। যাঁদের অ্যালার্জি আছে তাঁরা ঈদের মাংস খেলেও একই ধরনের অ্যালার্জিক রি-অ্যাকশন হবে। তাই কোরবানির সময় অ্যান্টি-হিস্টামিন জাতীয় ওষুধ দুবেলা করে তিন থেকে পাঁচ দিন সেবন করুন। সে ক্ষেত্রে গরুর মাংস খেতে পারবেন। প্রথমে এক-দুই টুকরা খান। কোনো সমস্যা না হলে ঈদের সময়টায় মাংস খাওয়া চালিয়ে যেতে পারেন। তবে অবশ্যই ওষুধ খেতে ভুলবেন না। কোনো সমস্যা মনে হলে খাওয়া বন্ধ করুন।
কোরবানির ঈদ এবং ঈদের মাংস খাওয়া সব বয়সী মানুষের জন্য আনন্দের ব্যাপার। সেই আনন্দ সবাই উপভোগ করতে পারবেন, যদি স্বাস্থ্যসম্মত করে রান্না করে পরিমাণ মতো খান।
গ্রন্থনায় : মাহফুজ আল মেহেদী