বগুড়ার গাছপাগল আব্দুল কাদেরের গল্প

0

লিমন বাসারবগুড়ার কাহালুর পল্লী চিকিৎসক আব্দুল কাদেরকে দশ গ্রামের মানুষ চেনেন একজন গাছপাগল মানুষ হিসেবে। সাধারণ গাছের সঙ্গে প্রীতি নয় তার। শুধু ঔষধি গাছের পাগল তিনি। বিগত ৪৩ বছর ধরে গাছ লাগান। নিজের এক টুকরো জমি ছাড়াও অন্যের জমির আইলে, সড়কের পাশে, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের পরিত্যক্ত জমিতে তিনি লাগিয়েছেন লক্ষাধিক গাছ। যেগুলোর সবই ঔষধি। অনেক বিলুপ্তপ্রায় গাছও তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। শুধু গাছ লাগিয়েই ক্ষান্ত নন তিনি, এসব ঔষধি গাছের লতাপাতা থেকে তৈরি ওষুধ ও গুণাগুণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেওয়াই তার কাজ। ৬৭ বছরের বৃদ্ধ এ মানুষটি এখনো সারাদিন অতিবাহিত করেন গাছ-গাছালির মধ্যে।
বগুড়ার কাহালু উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম ডোমনগ্রামে পল্লী চিকিৎসক আব্দুল কাদেরের বাস। পল্লী চিকিৎসক আব্দুল কাদের আগে একটি মেডিক্যাল কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন। গাছের প্রতি ভালোবাসার কারণে ১৯৬৬ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আজ পর্যন্ত ছুটে চলেছেন পথে-প্রান্তরে। কাহালু বাজার থেকে একেবারে দক্ষিণ দিকে প্রায় তিন-চার কিলোমিটারজুড়ে যত গাছ দেখা যায় তার বেশিরভাগই লাগিয়েছেন তিনি। এছাড়া নিজের এক টুকরো জমি ছাড়াও অন্যের জমিতে, জমির পতিত আইলে, স্কুল-কলেজে বড় হচ্ছে তার লাগানো ঔষধি গাছ। ঔষধি গাছের বাগান করেছেন তিনি কাহালু হাসপাতালে, মালঞ্চা আযিযুল হক মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজে, কাহালু ডিগ্রি কলেজে, ডোমনগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে, বনানী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসে। মানুষকে ঔষধি গাছের গুণাগুণ জানানোর দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি। একমাত্র চিন্তাভাবনা ঔষধি গাছ-গাছালি নিয়ে। প্রায় চার যুগ ধরে বিনা পয়সায় ঔষধি গাছ-গাছালির উপকারিতার বার্তা তিনি পেঁৗছে দিচ্ছেন মানুষের ঘরে ঘরে। সরকারি-বেসরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে উপজেলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তার নিজস্ব তৈরি করা ওষুধ নিয়ে। বিনা পয়সায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন তুলসী পাতার চা-পাতিসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ। তার লাগানো উল্লেখযোগ্য গাছের মধ্যে রয়েছে হরিফল, থানকুনি, দেশি আঁকর কলা, জষ্টিমধু, ছয় প্রকারের তুলসী গাছ, উলট কম্বল, কুলাকাটা, পিপুলদার, কারিপাতা, বাসক, নিম, নিশিন্দাসহ প্রায় দেড়শ প্রজাতির ঔষধি গাছ। এছাড়া দেশ থেকে বিলুপ্তপ্রায় পাশসিজা, পাথরকুচি, রাম তুলসী, রাখালখোসা, কেওড়া, সাদা ও কালো কুচ, সাদা কেনরী, ভূটি টেবরি, বেড়েলা, ত্রিশূল, পূনর্ণভা, ক্ষেতপাপড়া, পিপুল পাতা, গক্ষুর কাঁটা রয়েছে তার সংগ্রহে। আব্দুল কাদের জানান, কাহালু ছাড়াও বিভিন্ন সড়কের পাশে তিনি এসব গুণী গাছ লাগিয়েছেন। কিন্তু আগাছা ভেবে মানুষ তা নষ্ট করে ফেলে। কয়েক বছর আগে তিনি একবিঘা জমি লিজ নিয়ে ঔষধি গাছের বাগান করেছিলেন। এক রাতে কে বা কারা তাঁর সব গাছ নষ্ট করে ফেলে। নিজের বাগানের পাশে এসে অশ্রুসিক্ত হয়ে সে কথাই জানালেন তিনি।
ডোমনগ্রামের আতাহার আলী ও স্থানীয় সাংবাদিক তানসেন জানান, বর্তমানে ঔষধি গাছ লাগানো নিয়ে এবং ঔষধি গাছ-গাছড়ার উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে জানানোর জন্য সারাক্ষণই ব্যস্ত থাকেন কাদের। সংসার পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁর কোনো খেয়াল নেই। নিজের খেয়ে-পরে ঔষধি গাছ-গাছড়া দিয়ে পয়সা ছাড়াই মানুষের উপকার করার জন্য এলাকাবাসী তাঁকে গাছপাগল কাদের বলে ডাকেন। গাছ-গাছড়ার লতাপাতা দিয়ে বানানো আব্দুল কাদেরের ওষুধের উপকারিতা পেয়েছেন অনেক লোকজন। কাহালু থিয়েটারের সভাপতি আব্দুল হান্নান জানান, সর্দি, কাশি, আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগ তাঁর ওষুধেই ভালো হচ্ছে। কাহালু উপজেলা কৃষি অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, ঔষধি গাছ নিয়ে আব্দুল কাদেরের চিন্তাভাবনা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারিভাবে এ মানুষটিকে সহযোগিতা করার কথা ভাবছেন তাঁরা। আর এই সৎ উদ্যোগের অন্তরালের মানুষ কাদের জানান, এই কাজের জন্য ২০০২ সালে কৃষিমেলায় পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। তবে তিনি কোনো অর্থ, বিত্ত, সম্মান চান না। চান সবার সহযোগিতা। এলাকার অব্যবহৃত জমিতে ভেষজ উদ্ভিদ চাষ হবে এটাই তাঁর প্রত্যাশা।