ডাক্তার দেখানোর আগে পরে

0

ডা. মুনতাসীর মারুফ
চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লিখে দিয়েছেন। সেটা নিয়ে চেম্বারের বাইরেও চলে এসেছেন রোগী। হয়তোবা চলে এসেছেন বাড়িতেই। তখনই মনে পড়ল ‘ওহো, সেই কথাটি তো বলা হলো না’ বা ‘এটাও বলা তো জরুরি ছিল’ কিংবা ‘ওটা তো ঠিকমতো জেনে আসা হলো না।’ চেম্বারের কাছাকাছি থাকলে হয়তো অস্বস্তি নিয়ে আবার চিকিৎসকের কক্ষে উঁকি দেওয়াÑ ‘স্যরি ডক্টর, আরেকটা কথা…’। আর বাড়ি ফিরে এলে নিজের ওপর রাগ-ক্রোধ-বিরক্তি, চিকিৎসককে মোবাইল ফোনে পাওয়ার চেষ্টা, ও প্রান্ত থেকে ফোন ধরা হবে কি নাÑ সেই অনিশ্চয়তা।

ঘটনা বিরল নয়। একটু প্রস্তুতি নিলেই কিন্তু এ ধরনের সমস্যা এড়ানো যায়। ‘ডাক্তার দেখানো’ ব্যাপারটাকে একদম হালকাভাবে না নিয়ে যাওয়ার আগে কিছুটা প্রস্তুত হয়ে নিন, যাতে চিকিৎসকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ উপকারটা আপনি নিয়ে আসতে পারেন।

সমস্যা জটিল হওয়ার আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
অনেকেই পুরোপুরি কর্মক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত শারীরিক বা মানসিক সমস্যাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেন না, নিজেকে ধৈর্যশীল বা সহনশীল হিসাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ার কারণে অনেক সময় ছোট সমস্যাই পরবর্তীকালে জটিল আকার ধারণ করে। তখন হয়তো চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। তাই শারীরিক বা মানসিক সমস্যার লক্ষণ বুঝতে পারলে দ্রুতই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শরীরের যে কোনো স্থানে প্রচ- ব্যথা, খুব বেশি জ্বর, অনবরত বমি বা পাতলা পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, গুরুতর দুর্ঘটনা, হাড় ভাঙা, বোলতা-ভিমরুল বা সাপের দংশন, কুকুর-বিড়াল-ঘোড়া বা অন্য কোনো প্রাণীর আঁচড়-কামড়, কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত, মল বা মূত্রে রক্ত, ঘন ঘন প্রস্রাব, শরীরের লালচে দানা বা র‌্যাশ, দৃষ্টি বা শ্রবণে সমস্যাÑ হঠাৎ করে এসব উপসর্গ বা সমস্যা দেখা দিলে বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপসর্গের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। অসুখ বা আঘাতের কারণে জীবন সংশয়ের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে দ্বিধা করবেন না।

উপযুক্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন
চিকিৎসক হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যার চিকিৎসা শাস্ত্রে বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল) স্বীকৃত ডিগ্রি এবং পেশাগত সনদ রয়েছে। আমাদের দেশে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে কোনো ধরনের স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়াই অজ্ঞ, হাতুড়ে ব্যক্তিরা চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে ব্যবসা জমিয়ে বসে। ওষুধের দোকানের মালিক-কর্মচারী, হাসপাতালের আয়া, ওয়ার্ড বয়, পিয়ন, অফিসের কর্মচারী, এমনকি বাবুর্চিরাও ‘চিকিৎসক’-এর ভুয়া পরিচয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এমন দৃষ্টান্তও বিরল নয়। আবার কোনো কোনো চিকিৎসকও নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞ হিসাবে নিজেদের প্রচার করছেন। সুতরাং প্রকৃত চিকিৎসক বাছাইয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। নিশ্চিত হোন কে চিকিৎসক আর কে ভুয়া পরিচয়ধারী।

সমস্যার তালিকা তৈরি করুন
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে আপনি তাকে কী কী বলতে চান বা তিনি আপনার কাছে কী কী জানতে চাইতে পারেন, তার উত্তরের একটা তালিকা তৈরি করে ফেলুন। যেমন, আপনি হয়তো বুকে ব্যথার জন্য পরামর্শ নিতে চাইছেন। সেেেত্র আপনার চিকিৎসক জানতে চাইতে পারেনÑ ব্যথা কতদিন ধরে হচ্ছে, বুকের ঠিক কোন জায়গাটায় হচ্ছে, কোন সময় বেশি হচ্ছে, কোন সময়টায় শুরু হচ্ছে, কতণ ধরে ব্যথা থাকছে, এই ব্যথা আপনার জীবনাচরণের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলছে ইত্যাদি। মনে রাখবেন, নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর একটি তালিকা হবে, যত সংপ্তি ও কম কথায় গুছানো হয়, ততই ভালো। সমস্যার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথা লিখে শীর্ষ তালিকা করলে চিকিৎসক বিরক্ত হতে পারেন।

পুরনো ব্যবস্থাপত্র ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র সঙ্গে নিন
আপনি হয়তো একই সমস্যার জন্য বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছিলেন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে সেসব চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র, গুরুত্বপূর্ণ পরীা-নিরীার কাগজপত্র সঙ্গে নিন। দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মানসিক রোগ প্রভৃতির েেত্র এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আপনার চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট সব কাগজপত্রের একটি করে ফটোকপি নিজের কাছে রাখুন। অনেকে পূর্ববর্তী সাাৎ ও পরীা-নিরীার ফল কম্পিউটারে কম্পোজ করে রাখেন এবং পরবর্তী সাাতের সময় বা নতুন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় তা প্রিন্ট করে নেন। এতে নতুন তথ্যাদি সংযোজন করাও সুবিধাজনক। অনেকে আবার প্রেসক্রিপশন-পরীক্ষার রিপোর্টের সঙ্গে একই ফাইলে সাজিয়ে রাখেন হাসপাতাল, চিকিৎসক বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন খাতে খরচের বিল। এটি অপ্রয়োজনীয়, উপরন্তু একই সঙ্গে রাখার ফলে প্রয়োজনীয় কাগজটি খুঁজে বের করতেও সমস্যা হয়।

ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের রোগ সম্পর্কে জেনে রাখুন
অনেক রোগের সঙ্গে জেনেটিক কারণ সম্পর্কিত। রোগের ভবিষ্যৎ ও চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য এ বিষয়টি জানা থাকা জরুরি। প্রায়ই চিকিৎসক জিজ্ঞাসা করে থাকেন, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে বিশেষত মা-বাবা, ভাইবোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী, খালা-মামা, চাচা-ফুফুদের কেউ ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ বা ক্যান্সার বা মানসিক রোগাক্রান্ত ছিলেন কি না। অসুস্থ হওয়ার আগেই এ তথ্যগুলো বাবা-মা বা নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে জেনে
রাখা উচিত।

শারীরিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি
অনেক েেত্রই রোগীর শারীরিক পরীার প্রয়োজন পড়ে। এ ব্যাপারেও পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন। ঢিলেঢালা পোশাক পরুন যাতে সহজেই চিকিৎসক আপনাকে পরীা করতে পারেন। দ্রুত খোলা ও পরা যায় এমন পোশাক পরে যাওয়াই ভালো। ফুলহাতা বা আঁটোসাঁটো জামা পরলে রক্তচাপ মাপার েেত্র অনেক সময় অসুবিধা হয়। অনেকেই পান খেয়ে মুখ পরিষ্কার না করেই চিকিৎসকের কক্ষে ঢোকেন বা চিকিৎসকের সামনে বসেই পান চিবুতে থাকেন। এতে চিকিৎসকের যেমন বিরক্তি উৎপাদন করা হয়, তেমনি মুখগহ্বর-জিহ্বার পরীক্ষাও ব্যাহত হয়।
সঙ্গী থাকুক কেউ
কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে সঙ্গে নিন। চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার সময় ভুলে যাওয়া কোনো বিষয় মনে করিয়ে দিতে বা কোনো বিষয় চিকিৎসকের কাছ থেকে ভালোভাবে বুঝে নিতে ওই বন্ধু বা আত্মীয় সাহায্য করতে পারেন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং তার সঙ্গে কথা বলাটাই অনেকের কাছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয়। নিকটজনের সঙ্গ সেই উদ্বেগ অনেকখানিই প্রশমিত করে রাখতে পারে। খেয়াল রাখবেন, যাকে সঙ্গে নিচ্ছেন, তিনি যেন আপনার ঘনিষ্ঠ এবং আপনার রোগ সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল থাকেন।

সত্যবাদী হোন নিজের স্বার্থেই
হোক তিনি চিকিৎসকÑ তবুও তো আপনার কাছে একদমই অপরিচিত একজন মানুষ। অপরিচিত কারো কাছে নিঃসঙ্কোচে সব কথা বলা আসলেই বেশ কঠিন। তবে মনে রাখবেন আপনার সুষ্ঠু চিকিৎসার স্বার্থেই কোনো তথ্য গোপন করা উচিত নয়। অনেক েেত্রই দেখা যায়, রোগী তার ধূমপান বা মদ পানের বিষয়টি গোপন করে যেতে চান বা বিষয়টি তত গুরুতর নয় বলে দেখাতে চানÑ বিষয়টি একদমই অনুচিত। চিকিৎসককে আপনি ‘ইমপ্রেস’ করতে যাচ্ছেন না, যাচ্ছেন আপনার সমস্যার সমাধান জানার জন্য। এেেত্র ‘ডাক্তার কি মনে করবেন’ ভেবে অস্বাস্থ্যকর জীবনাচরণের কথা গোপন রাখা উচিত নয়। প্রতিদিন যৌন সমস্যায় ভোগা প্রচুর রোগী শুধু মাথাব্যথা বা অনির্দিষ্ট ব্যথা বা হাত-পা-গা জ্বালা পোড়ার কথা বলে চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাদের প্রকৃত সমস্যা রয়ে যাচ্ছে আড়ালেই। যদি আগে ওষুধ খাওয়ার ব্যাপারে অনিয়ম করে থাকেন, সেটাও স্বীকার করুন; নচেৎ চিকিৎসক আগে সেবন করা ওষুধের ব্যাপারে ভুল ধারণা পাবেন।

ভালো করে বুঝে নিন পরামর্শ
আপনার চিকিৎসক আপনাকে কী পরামর্শ দিচ্ছেন, তা ভালো করে শুনে নিন। বুঝতে না পারলে আবার জিজ্ঞাসা করুন। নতুন কোনো পরামর্শপত্র দেওয়া হলে ওষুধের নাম, কখন কীভাবে খেতে হবে ভালো করে বুঝে নিন। মনে রাখুন, শুধু ওষুধ নয়, চিকিৎসকের পরামর্শমতো জীবনাচরণ ও খাদ্যাভ্যাস সুস্থ থাকার জন্য জরুরি।

রোগ সম্পর্কে জানুন
এ যুগে আপনার অসুখ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য চিকিৎসকই একমাত্র মাধ্যম নন। অনেক ব্যস্ত চিকিৎসকের চেম্বারে সহকারী থাকেন। চিকিৎসকের ব্যস্ততা বেশি হলে তার সহকারীর কাছ থেকে আপনার রোগ সম্পর্কে জেনে নিন। বর্তমানে দেখা যায়, অনেক চিকিৎসক রোগীকে রোগ সংক্রান্ত তথ্যাবলি সংবলিত লিফলেট বা ছাপানো কাগজ সরবরাহ করেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমেও আপনি রোগ সংক্রান্ত তথ্যাবলি জানতে পারেন। তবে এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। হাজারো তথ্যের ভিড়ে আপনি বিভ্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টদের পরামর্শমতো এবং নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ব্রাউজ করুন।