রোজায় সুস্থ থাকতে করণীয়

0

রোজায় সুস্থ থাকতে করণীয়
রোজায় সুস্থ থাকতে করণীয়
॥ মিনহাজ আবেদীন ॥  যিনি রোজা রাখছেন তাকে প্রথমেই ল্য রাখতে হবে, রোজা রেখেও যেন তার শরীরে প্রতিটি পুষ্টি উপাদান সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে সরবরাহ হয়। রোজা রেখে তিন বেলা কোন ব্যক্তির চাহিদা অনুযায়ী সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্টির এ জোগান নিশ্চিত হয়। পান্তরে এ সময়ে বাইরের খোলা বা বাসি, পচা বা পুরনো তেল দিয়ে ভাজা খাবার খেলে পুষ্টি তো পূরণ হয়ই না, উপরন্তু বিভিন্ন রোগব্যাধি শরীরকে আক্রমণ করে বসে।

শারীরিক সুস্থতা আবার নির্ভর করে মানসিক সুস্থতারও ওপর। এ সময়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ, ধর্মীয় জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হলেই রোজা রাখা পরিপূর্ণতা লাভ করে।

রোজাদারের খাদ্য গ্রহণ :  সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় আমরা ৫-৬ বার খেয়ে থাকি। কিন্তু রোজার এই সময়ে রোজাদারেরা ৩ বার অর্থাৎ ইফতার, সন্ধ্যারাত ও সেহরিতে খেয়ে থাকেন। একজন রোজাদারের তার বয়স, পরিশ্রম, শারীরিক অসুস্থতা অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণে কোন নিয়ন্ত্রণ বা কোন খাদ্য বেশি খাওয়ার পরামর্শ থাকলে সে অনুযায়ী তিন বেলা খাদ্য নির্বাচন করা উচিত।

সারা দিন রোজা রাখার পর শরবত একটি উত্তম পানীয় কিন্তু একজন ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে এটি পান করা উচিত নয়। অর্থাৎ তিনবারের খাদ্য বণ্টন এমন হতে হবে যেন শারীরিক প্রতিটি পুষ্টি এ খাদ্য তালিকা থেকে পাওয়া যায়। প্রৌঢ় বয়সে সারা দিন রোজা রাখার পর যে কান্তি, অবসাদ ও দুর্বলতার সৃষ্টি হয়; তা এই সুষম খাদ্য গ্রহণের ফলে পূরণ হয়।

স্বাস্থ্যসম্মত বা সুষম খাবার বলতে কী বোঝায় :  সুষম খাবার একেক বয়সের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। তবে সাধারণভাবে ৬টি গ্র“পে এ খাদ্যকে ভাগ করা যায়।

প্রথমটি হল কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা। শর্করা বলতে ভাত, মুড়ি, চিড়া, রুটি ইত্যাদিকে বোঝায়। দ্বিতীয়টি হল প্রোটিন, যেমন মাছ, মাংস, ডিম ও সেকেন্ডারি প্রোটিন ডাল বা বিচি-জাতীয় খাবার। তৃতীয়টি হল দুধ বা দুধজাত খাদ্য। এগুলো ফিরনি, দই, ছানা ইত্যাদি।

এরপর যে খাবার আমাদের শরীরে প্রতিদিন অবশ্যপ্রয়োজনীয় তা হল শাক ও সবজি। অন্য খাদ্যগুলো পরিবর্তন করে খাওয়া গেলেও এটি প্রতিদিন পরিমাণমতো খাওয়া উচিত। চতুর্থ হল ফল এবং পঞ্চম তেলজাতীয় খাদ্য। একজন ব্যক্তির সুস্থতার জন্য ওপরের প্রতিটি খাবার সুষমভাবে খাওয়া দরকার।

রোজায় এই সুষম খাদ্য কীভাবে বণ্টন করা উচিত :  ইফতারিতে ভাজা-পোড়া জাতীয় খাদ্যের আধিক্য দেখা যায় প্রধানত দুটি কারণে। একটি হল পারিবারিক বা ঐতিহ্যগতভাবে এটির প্রচলন হয়ে আসছে এবং দ্বিতীয়টি হল দীর্ঘণ না খেয়ে থাকার ফলে একটু ঝালজাতীয় বা ভাজা-ভুনা খেতে আমাদের স্বাদ লাগে। কিন্তু এই খাদ্য গ্রহণের আগে আমাদের কয়েকটি ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে; তা হল এই খাদ্যগুলো হতে পারবে না বাইরের কোন খোলা খাবার।

দ্বিতীয়ত এটা হতে পারবে না কোন দোকানের বাসি-পচা খাবার এবং তৃতীয়ত অবশ্যই ল্য রাখতে হবে এ খাদ্যটি ভেজালমুক্ত কি না। আমরা কিন্তু ইফতারে প্রধানত ডাল-বিচি গ্র“পের খাদ্য খেতে পছন্দ করে থাকি। পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, ঘুগনি, চটপটি সবই এ গ্র“পেরই অন্তর্ভুক্ত।

মজার বিষয় এই যে, একজন মানুষের একই সঙ্গে একই গ্র“পের এত নিউট্রিয়েন্টস প্রয়োজন হয় না। নিয়ম হচ্ছে আপনি যদি পাঁচ পদের ইফতার করেন তবে পাঁচ গ্র“পের খাদ্য থেকে তা বাছাই করবেন। ফলে সুস্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের নিউট্রিয়েন্টস সরবরাহ হয়। এ খাদ্যগুলো গ্রহণের পরিমাণ বয়সভেদে ব্যক্তিবিশেষের চাহিদার ওপর নির্ভর করে। ইফতারে বিভিন্ন ফল দিয়ে তৈরি কাস্টার্ড, মিল্ক সেক তৈরি করা যায়। এ সময় ফলের রস, মিষ্টিজাতীয় খাবার যেমন মিষ্টি, সুজি, সেমাই খাওয়া ভালো।

বাইরের বা দোকানের খাদ্য কি খাওয়া উচিত? :  দোকানে রোজার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সাধারণত একই তেল ব্যবহার করা হয়। পুরনো তেলের সঙ্গে নতুন তেল মিশিয়ে কোন কিছু তৈরি করা হয়। এ পুরনো তেল ঘি বা ডালডার চেয়েও তিকর। এটি হৃদরোগ ও রক্তনালিতে খারাপ কলস্টেরল জমার ঝুঁকি বাড়ায়।

দ্বিতীয়টি হল পুরনো বেসন বা ডাল বা পেঁয়াজের সঙ্গে নতুন কিছু মিশিয়ে কোন খাদ্য তৈরি করা হয়ে থাকে। ফলে এর পুষ্টিমান তো থাকেই না উপরন্তু এ খাদ্য গ্রহণে জটিল ব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তা ছাড়াও বদহজম, ডায়রিয়া, পেটফাঁপা, পেটব্যথা, চর্মরোগ ইত্যাদি ধরনের অসুস্থতা হতে পারে। বাইরের খাবারের সঙ্গে যে রঙ ব্যবহার করা হয় তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দোকানদাররা অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকেন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যজ্ঞান নেই। তাই ঘরের খাবার খাওয়া অনেক স্বাস্থ্যসম্মত।

ভাজা-পোড়া খাওয়া কি শুধুই খারাপ? :  এ ধরনের খাদ্য গ্রহণে শরীরের জন্য ভালো ও মন্দÑ দুটিই হতে পারে। ভালো দিকটি হচ্ছে দীর্ঘণ না খেয়ে থাকার ফলে এ-জাতীয় উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ বা ইমপ্র“ভড ডায়েট আমাদের শরীরে শক্তির জোগান দেয়। আবার উপবাসের ফলে আমাদের শরীরে মাংসপেশিগুলো যে শিথিল হয়ে পড়ে তার য় থেকে রা করে। কিন্তু এর খারাপ দিকটিই বেশি। যদি কারও এসিড বা পেপটিক আলসার বা পাকস্থলীতে কোন অসুখ থাকে তবে তাদের ক্ষেত্রে এ ভাজা ভুনা খাবার হজম করতে কষ্ট হয়। অপর দিকে রোজার সময়ে একজন সুস্থ ব্যক্তিরও এ ধরনের খাদ্য গ্রহণের ফলে শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াও ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

রোজা রাখলে কি ওজন কমে? :  অনেকেই এ মাসটিকে ডায়েটিং করে ওজন কমানোর একটি উত্তম মাস বলে মনে করেন। কিন্তু এ মাসে তেলে ভাজা খাদ্যের আধিক্য থাকায় রোজার পর দেখা যায় তাদের ওজন আরও ৩-৪ কেজি বেড়ে গেছে। এর কারণ তেল ভাত-রুটির চেয়ে আড়াই গুণ বেশি ওজন বাড়ায়। অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাদ্য খেয়ে অনেকে আবার এ সময়ে হৃদরোগ বাঁধিয়ে বসেন। কারণ বাইরের তেলে সয়াবিনের চেয়ে ডালডা বা মাংসের চর্বি ব্যবহার করা হয়।

এ সময়ে ফলমূল, শাক-সবজি খাওয়া উপকারী কেন? :  আমাদের শরীরে প্রধানত দুই ধরনের পুষ্টি দরকার। একটি হচ্ছে যে খাদ্য আমাদের শক্তি দেয় যা ভাত-রুটি থেকে আসে এবং দেহ গঠনে সাহায্য করে মাছ-মাংস। আর শরীরের ভেতর রোগপ্রতিরোধ মতা বা ইমিউনিটি তৈরি হয় শাক-সবজি, ফলমূল থেকে। এমনকি আমাদের শরীরের অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিনের প্রধান উৎস হচ্ছে এই ফলমূল, শাক-সবজি। তাই রোজা রেখে শরীরের য়পূরণের জন্য এই খাদ্য গ্রহণ প্রয়োজন।

তথ্য-
ডা. ফাহিম আহমেদ রুপম
প্রিভেন্টিভ মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
সেন্ট্রাল হসপিটাল লি.।