যুগদ্রষ্টা ও যুগস্রষ্টা: জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম

0

ডা. এম এ কাশেম:
বাংলাদেশে পোস্টগ্রাজুয়েট চিকিৎসাব্যবস্থার স্থপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের আজ (২৪ জানুয়ারি) পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। চিকিৎসা গবেষণা, শিক্ষকতা, নিয়মানুবর্তিতা ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতায় তার সমান্তরাল কোনো ব্যক্তি সমাজে এখনও বিরল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. নুরুল ইসলামের কিছু অবদানে কথা আজ উলে­খ করলাম।

ওষুধনীতি- ১৯৮২ সালে ওষুধনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার বন্ধে কাজ করেছিলেন। এর ফলে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো ড্রাগ পলিসির মাধ্যমে সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায় ডা. নুরুল ইসলামের অবদানে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর লো টেকনোলজির ওষুধ দেশিয় ওষুধ কোম্পানিগুলো উৎপাদন শুরু করে। পক্ষান্তরে হাই প্রফাইল ওষুধ বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে দেশিয় কোম্পানিগুলোও উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে। কোটি কোটি ওষুধ তৎকালীন IPGMR প্রতিষ্ঠা- বাংলাদেশে উচ্চতর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরিতে IPGMR-ই ছিল একমাত্র পতিষ্ঠান। তিনি এই প্রতিষ্ঠানে সুদীর্ঘকাল পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সঙ্গে যুগ্ম পরিচালক হিসেবে ছিলেন আরেক প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডা. এম আর খান লিখেছেন- একবার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর জন্য জোরাল আন্দোলন শুরু করল। ডা. নুরুল ইসলাম ছাত্রছাত্রীদের ডাকলেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানালেন ‘You can shift the director but not the date of Examination’ তার দৃঢ়তায় পরীক্ষার্থীরা যথাসময়ে পরীক্ষায় অংশ নেন।

আধূনিক- তামাক ও ধূমপানবিরোধী আন্দোলন ‘আমরা ধূমপান নিবারণ করি বা আধূনিক’-এর তিনি সূচনাকারী। আধূনিকের লোগো সে সময়ে তামাকবিরোধী সচেতনতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় আজ তামাকবিরোধী অনেক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে যা তামাকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখে চলেছে।’

সর্ববৃহৎ বেসরকারি ইউনিভার্সিটি ইউএসটিসি’র প্রতিষ্ঠাতা ভিসি- বিজ্ঞান ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ অবকাঠামো, অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী, নৈসর্গিক পরিবেশ ও বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে সমৃদ্ধ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (ইউএসটিসি) ১৯৯২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়েয় ছাত্রছাত্রীরা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত।

তার প্র্যাকটিস জীবনের কিছু খণ্ডচিত্র উপস্থাপন করলাম- ধন্বন্তরী চিকিৎসক বলতে যা বোঝায় তিনি তাই ছিলেন। তার অনেক প্রেসক্রিপসনে লেখা থাকত- ‘কোনো ওষুধের প্রয়োজন নেই’। এর সঙ্গে দু-একটি উপদেশ ও জীবনাচারের পরামর্শ থাকত। রোগীদের তিনি প্রায়ই বলতেন- Medicine is a useful Poison. তার এক নিকট আত্মীয়ের বড় ছেলের পায়ের সমস্যা দেখা দিলে পায়ের একাংশ কেটে ফেলার পরামর্শ দিলেন কলকাতার ডাক্তার। রোগীকে দেখে ডা. নুরুল ইসলাম পরামর্শ দিলেন পায়ের কিছুই করতে হবে না এবং ওষুধ দিলেন। পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা পেয়েছিল এ ছেলেটি।

সময়ানুবর্তিতা ছিল তার চরিত্রের অন্যতম দিক। আইপিজিএম-আর (বর্তমানে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)। পরিচালক থাকাকালীন তিনি সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে হাসপাতালে উপস্থিত হতেন এবং বিকাল ২টা ৩০ মিনিটে অফিস ত্যাগ করতেন। আবার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে হসপাতালে এসে রাত ৯টার দিকে ফিরে যেতেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং সে সময়ে জাতীয় অধ্যাপকের ক্লিনিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ জানিয়েছেন- স্যার সকালে হাসপাতালে ঢোকার মুখে দাঁড়াতেন এবং হাসপাতালের শিক্ষক, ডাক্তার, ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত হচ্ছেন তা অবলোকন করতেন।

বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য- স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ডা. নুরুল ইসলামের নৈকট্য ও সখ্য স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বিকশিত ও প্রস্ফুটিত করতে সাহায্য করেছে। বঙ্গবন্ধুর বাবা-মাকে, জননেতা মওলানা ভাসানী, কবি নজরুল ইসলাম এবং সে সময়ের অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আইপিজিএমআরে তিনি পরম যত্ন ও মমতায় চিকিৎসা দিতেন।

পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল শিক্ষা- ১৯৬০ সালের দিকে ডা. নুরুল ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকল্টি অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন খোলা হয়। এর অধীনে এমফিল ও এমডি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ হয়। বর্তমানে সিনিয়র অধ্যাপকদের FCPS, MD ডিগ্রি অর্জন তার কীর্তির নীরব স্বাক্ষর।

চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় বিচরণÑ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সম-সাময়িক মেডিকেল সায়েন্সের সব ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে অবহিত থাকতেন। তার আগ্রহ ছিল ভারতীয়, চৈনিক ও মধ্যপ্রাচ্যের হেকিমি পদ্ধতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে জানা। তিনি হোমিওপ্যাথি ও হেকিমিকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তার সংগ্রহে ছিল এ হিস্ট্রি আব মেডিসিন ইন চায়না, শিবকালী ভট্টাচার্য লিখিত দশ ভলিউমের ভারতীর বনৌষধি শাস্ত্রের ইতিহাস।

মাতৃভক্তি- কোনো কাজে যাওয়ার আগে তিনি তার মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে যেতেন। ঘরে ফেরার সময়ও মায়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। মায়ের প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধা আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।

অর্জন- দেশি-বিদেশি প্রায় ৩২টি পুরস্কারে তিনি ভ‚ষিত হয়েছেন, এর মধ্যে উলে­খযোগ্য হচ্ছে- রাস্ট্রপতি স্বর্ণপদক (১৯৬৩), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০৩)। ১৯৮৭ সালে জাতীয় অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করেন।

শেষ করছি ডা. নুরুল ইসলামের উলে­খযোগ্য কিছু উক্তি স্বরণ করে-
-শত্রুতা/সমালোচনা সতর্কতা আনে, সতর্কতা সফলতা আনে।
-Reading makes a man
writing makes a perfect man
seminar makes a ready man
যখন কেউ আপনার কাজের সমালোচনা করে তখন বুঝতে হবে আপনি ঠিক কাজটিই করছেন।
-জীবনের গতিপথে যত বেশি সফলতা লাভ করবেন, সুনাম অর্জন করবেন, শত্র“ সংখ্যাও ততই বাড়বে।
-যাদের কথা অর্ধেক বুঝা যায় আর অর্ধেক বুঝা যায় না তাদের চেয়ে যাদের কথা পরিষ্কার বোঝা যায় তারা অধিকতর উত্তম।

লেখক: ডা. এম এ কাশেম
পরিচালক, সেন্ট্রাল হসপিটাল লি.