খেতে অরুচি হলে কী করবেন

0

অনেক পিতা-মাতা বা অভিভাবক ডাক্তারের কাছে গিয়ে তাদের সন্তানকে নিয়ে অভিযোগ করেন- বাচ্চা কিছু খায় না, স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে না, লম্বা-চওড়া হচ্ছে না ইত্যাদি। অনেক রোগী আছেন যাদের প্রধান সমস্যা খাবারে অরুচি বা ক্ষুধামন্দা- ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে এনোরেক্সিয়া বলা হয়। এ সম্পর্কে লিখেছেন আনোয়ার খান মর্ডান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. তাহমিনুর রহমান সজল

মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশ ক্ষুধা লাগা নিয়ন্ত্রণ করে। এর কার্যকারিতা ব্যক্তির আচার-আচরণ এবং কিছু ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে –

হাইপোথ্যালামাস : ক্ষুধা এবং পানীয় গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস যখন উত্তেজিত হয় তখনই ক্ষুধা লাগে এবং আমরা খাদ্য গ্রহণ করে থাকি। এর পাশের স্থানকে ক্ষুধার কেন্দ্র বলা হয়। কোনো কারণে এই দুই পাশের স্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ক্ষুধামন্দা হয়। এর ফলে ওজন কমে যায়। হাইপোথ্যালামাসের মধ্যবর্তী অংশ উত্তেজিত হলে ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় এবং খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়।

উচ্ছ্বাস ও আচার-আচরণ : হাইপোথ্যালামাসের লিম্বিক সিস্টেম এবং প্রিফ্রন্টার কর্টেক্স ব্যক্তির উচ্ছ্বাস এবং আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথ্যালামাস শরীরের বিভিন্ন প্রান্তিক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং উচ্ছ্বাস প্রকাশ, হৃৎপিণ্ডের গতি ও রক্তচাপ বাড়ানো, মুখ শুষ্ক হওয়া, ত্বকে ফ্লাসিং বা ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করা, ঘামা এবং পাকস্থলী ও অন্ত্রণালীর সংকোচন ও প্রসারণ বাড়িয়ে দেয়।

জিহ্বা ও মুখের অসুখ : জিহ্বা প্রদাহ, জিহ্বার ওপরে উপস্থিত প্যাপিলা ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া, মুখের ঘা, প্রদাহ, রক্তশূন্যতা ইত্যাদির কারণে খাওয়ায় রুচি কমে যেতে পারে। মুখ ও দাঁতের অযত্নের জন্যও রুচি কমতে পারে।
খাদ্যনালি, পাকস্থলী, অন্ত্রের অসুখ : প্রদাহ, ঘা, যক্ষ্মা, ক্যান্সার, ম্যালএবসরপশান, কৃমি খাওয়ার রুচি কমাতে পারে।

নিঃসরিত পদার্থ : TNF, ILI, IL6-8-এর কারণে ক্ষুধামন্দা, তন্দ্রাভাব বেশি প্রদাহের জন্য রক্তচাপ কমে গিয়ে দেহ ক্লান্ত হয়ে যেতে পারে। TNF (টিউমার নেক্রোসিস ফ্রাক্টর) শরীরে আমিষ, চর্বি সংগঠিত করে, ক্ষুধামন্দা বা খাওয়ার রুচিকে কমিয়ে রাখে, ফলে রোগীর ওজন কমে যায় এবং অরুচি হয়। এ অবস্থাকে ক্যাকেকসিয়া বলে। প্রাদাহ এবং ক্যান্সার রোগে দেহ শীর্ণতা দেখা যায়।

রুচি এবং বিপাক ক্রিয়া : কর্টিকোট্রাপিন রিলিজিং হরমোন, আলফা মেলনোসাইট স্টিমুলেটিং হরমোন, কোকেইন এবং এমফিটামিন রিলেটেড ট্রান্সক্রিপ্ট অরুচি, ক্ষুধামন্দা তৈরি করে। গ্লুকাগন, সোমটোস্টাটিন ও কলিসিস্টোকাইনিন হরমোন খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয়।

লেপটিন : এটি চর্বিকোষ নিঃসরণ করে। হাইপোথ্যালামাসের ওপর কাজ করে খাবার গ্রহণ কমিয়ে দেয় এবং এনার্জি খরচ বাড়িয়ে দেয়। লেপটিনের অপর্যাপ্ততা বা ডেফিসিয়েন্সিতে চর্বির পরিমাণ কমে যায়, রুচি বাড়ে এবং খাওয়া বেড়ে যায়।
বিশেষ ধরনের ক্ষুধামন্দা রোগ

এনোরেক্সিয়া নারভোসা : উঠতি এবং বয়ঃসন্ধিক্ষণে এ রোগ শুরু হয় এবং মেয়েদের মধ্যে যারা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তাদের এ রোগে ভোগার আশংকা বেশি। লক্ষণ হচ্ছে স্বাভাবিক প্রত্যাশিত ওজন থেকে ১৫ শতাংশ কম, শরীর ভেঙে যাওয়া, ওজন বাড়ার ভয়, খাওয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ, মেয়েদের কমপক্ষে পরপর ৩ মাস মাসিক বন্ধ থাকা। পিতা-মাতা বা অভিভাবক চান না তার ছেলে বা মেয়ের স্বাস্থ্য ভালো হয়ে মোটা হয়ে যাক। রোগী ভয়ে বেশি খেতে চায় না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক হতে চায় না এবং পারিবারিক দায়িত্ব ভাগ করে নিতে চায় না।

লক্ষণ : শীর্ণ শরীর, শীত সহ্য করতে পারে না, কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত হয়, মাসিক বন্ধ থাকে। নাড়ির গতি ও রক্তচাপ কম হয় এবং গা ঠাণ্ডা থাকে। পরীক্ষা করলে শরীরে চর্বির পরিমাণ কম পাওয়া যায়, শরীরে অপ্রত্যাশিত লোম গজায়, পারোটিড গ্ল্যান্ডে বড় ও ফুলে যেতে পারে।

পেপটিক আলসার : বমি ভাব এবং ক্ষুধামন্দা গ্যাস্ট্রিক আলসারের জন্যও হয়। এজন্য অন্ত্রনালির পথ বন্ধ হলে বা গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার হলে বমি হয় এবং ওজন কমে যায়।
ফুসফুসে ক্যান্সার : এ রোগীদের ৫৫-৮৮ শতাংশ ওজন কমে যায় অরুচির কারণে।
প্রতিরোধের উপায়
* তিন-ছয় মাস বয়স থেকে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার খেতে উৎসাহিত করতে হবে।
* সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে হবে।
* শরীরের ওজন ও উচ্চতা অনুযায়ী ঠিক করতে হবে এবং সঠিক অনুপাতে আমিষ, চর্বি, শর্করা, ভিটামিন ও মিনারেল এবং ট্রেস এলিমেন্ট সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে।
* ফাস্ট ফুড বা চাঙ্ক ফুড যেমন বার্গার, স্যান্ডউইচ, চিপস, পিজা এবং বেশি দুগ্ধজাত খাবার যেমন আইসক্রিম ইত্যাদি বেশি খেতে নিরুৎসাহিত করা।
* নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, হাঁটা, সময়মতো ঘুমান ও আহার গ্রহণ।
* যেসব রোগের সঙ্গে ক্ষুধামন্দা সম্পৃক্ত সেগুলোর রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা গ্রহণ।
নবজাতকের অরুচি-ক্ষুধামন্দা : পরিমাণমতো পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পেলে শিশুর ক্ষুধামন্দা হতে পারে। পেটে গ্যাস জমা হলে ব্যথায় শিশু কান্নাকাটি করবে। তাই প্রতিবার বুকের দুধ খাওয়ার পর বুকের ওপর শিশুকে শুইয়ে পিঠে চাপ দিয়ে হাঁটলে গ্যাস বের হয়ে যাবে এবং শিশু ঠিকমতো খাবে। যখন শিশুর ভ্যাকসিন দেয়া হয় তখন দুই-তিন দিন শিশু ক্ষুধামন্দায় ভুগতে পারে। পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, জ্বর ইত্যাদির কারণেও শিশুর অরুচি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

শিশুর অরুচি-ক্ষুধামন্দা : ১২ বছর পর্যন্ত উঠতি ছেলেমেয়েদের বাইরের খাবারের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। ফাস্টফুড, চানাচুর, চটপটি, আচার, আইসক্রিম, চকোলেট, সফট ড্রিংক ইত্যাদি তারা খেয়ে থাকে। পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, জন্ডিস, কৃমি, পরজীবী, জ্বর, প্রদাহ ইত্যাদির জন্য শিশুর অরুচি-ক্ষুধামন্দা হতে পারে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিচর্যার ওপর জোর দিতে হবে।