ইনসুলিন পাম্প : দীর্ঘদিন থাকবেন ভাবনামুক্ত

0

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় থেমে নেই বিজ্ঞানীরা। নিত্যনতুন আবিষ্কার করছেন তারা। সাম্প্রতিককালে স্টেমসেল নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। আগে মনে করা হতো, আইলেটস কোষগুলো বিভাজিত হয় না। এ নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতিও হয়েছে বেশ। এ পরীক্ষা সফল হলে ডায়াবেটিসে মিলবে চিরমুক্তি। ইনসুলিন পাম্প :ডায়াবেটিস আক্রান্তদের ইনজেকশনের মাধ্যমে ইনসুলিন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এতে অনেক রোগীর সঠিকভাবে গ্গ্নুকোজ নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাদের জন্য এসেছে ইনসুলিন পাম্প। এটি মোবাইল আকারের একটি যন্ত্র। এ যন্ত্র থেকে চিকন নলের মাধ্যমে ত্বকের নিচে ইনসুলিন সরবরাহ করা যায়। এটি সারাক্ষণই ইনসুলিন সরবরাহ করে। তবে ঠিক করে দিতে হবে কী পরিমাণ ইনসুলিন সরবরাহ করবে যন্ত্রটি। যেমন খাওয়ার পর ইনসুলিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মিটারের মাধ্যমে দেহে বেশি করে ইনসুলিন সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। ঠিক তেমনি দেহের স্বাভাবিক কার্যকলাপ পরিচালিত হওয়ার জন্য কম পরিমাণে ইনসুলিন সরবরাহ করবে আপনার ঠিক করে দেওয়া পরিমাণমতো। এ কারণে দেহের স্বাভাবিক কাজ চলতে থাকে নন-ডায়াবেটিকের মতোই। এ পাম্প ব্যবহারের সুবিধা কিন্তু ইনজেকশনের চেয়ে অনেক বেশি। এক্ষেত্রে দ্রুত কাজ করে এমন ইনসুলিন ব্যবহারের ফলে রক্তে গ্গ্নুকোজের মাত্রা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। সারাক্ষণ কম পরিমাণে ইনসুলিন নিঃসৃত হয় বলে সবসময় রক্তে গ্গ্নুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। ডায়াবেটিকে আক্রান্তরা মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে পারেন না। এ নিয়ে তাদের কষ্টের সীমা নেই। এ যন্ত্র ব্যবহারের ফলে তারা যে কোনো খাবার পরিমাণমতো খেতে পারবেন নিশ্চিন্তে। শুধু খাবারের পর ইনসুলিনের ডোজ বাড়িয়ে দিলেই হলো। প্রতিদিন একাধিক ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সবসময় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রিত থাকে বলে চোখ, কিডনি ও স্নায়ুর সমস্যা কম দেখা দেয়। মোটকথা, এটি ব্যবহারে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন ডায়াবেটিস আক্রান্তরা। ব্যয়বহুল বলে এটি আমাদের দেশে ব্যবহার হয় না বললেই চলে।
ইনসুলিন পেন : এর মাধ্যমে সহজেই ইনসুলিন ইনজেকশন দেওয়া যায়। ইনসুলিন কার্টেজ, ডোজ অধিক করার জন্য ডায়াল ও ইনসুলিন শরীরে সরবরাহের জন্য নিডল বা সুচ নিয়ে ইনসুলিন পেন। দেড়শ’ থেকে তিনশ’ ইউনিট ইনসুলিন ধরতে পারে এতে। এটি দিয়ে সূক্ষ্মভাবে ডোজ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এমনকি অর্ধেক ইউনিট পর্যন্ত। এটি ব্যবহার ঝামেলামুক্ত ও ব্যথা লাগে না বললেই চলে। নিজের ইনজেকশন নিজে দেওয়া যায় সুবিধাজনকভাবে। আমাদের দেশেও এটি পাওয়া যায়। দাম পড়বে ১৭০০-২০০০ টাকা।
নতুন ধরনের ইনসুলিন :এছাড়াও ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে ইনসুলিন স্প্রে। মুখে স্প্রে করলে তা মুখ, গলা ও জিহ্বা দিয়ে দ্রুত রক্তে পেঁৗছে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাবে। অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে ইনসুলিন পিল। মুখে ইনসুলিন সেবন করলে অন্ত্রের অ্যানজাইম ইনসুলিনকে ভেঙে দেয়। এজন্য ইনসুলিন ইনজেকশন আকারে দিতে হয়। সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে নতুন ধরনের পলিমার। এ পলিমার দিয়ে ইনসুলিন পিলকে ঢেকে দেওয়ার ফলে অন্ত্রের অ্যানজাইম ইনসুলিনকে ভেঙে দিতে পারে না। এছাড়া নতুন ধরনের ইনসুলিনের মধ্যে লং অ্যাকটিং গল্গারজিন (দাম : ৩-৪ হাজার টাকা) ও লিভেমির (২-৩ হাজার টাকা) এবং শর্ট অ্যাকটিং অ্যাসপার্ট (৪০-৫০ পয়সা/ইউনিট) ও গ্গ্নুলাইসিন। নতুন লং অ্যাকটিংগুলো ২৪ ঘণ্টা ধরে কাজ করলেও হাইপোগল্গাইসেমিয়া করে না। আর শর্ট অ্যাকটিংগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাবারের পর ১৫ মিনিট অপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না। খাবারের সঙ্গে সঙ্গে এটি দেওয়া যায়। নতুন আবিষ্কৃত ইনসুলিন মিক্সার ৭৫-২৫ বা ৭০-৩০ লিসপ্রো। শর্ট অ্যাকটিং লিসপ্রোর সঙ্গে ইনসুলিন এনালগ এনপিএল মিশিয়ে এটি তৈরি করা হয়। যাদের রক্তে কঠোরভাবে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন তাদের জন্য এটি বেশ উপকারী। এটি দেশে পাওয়া যায়।
সেবনের নতুন ওষুধ : সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ইনক্রেটিন নামক আন্ত্রিক হরমোন আবিস্কার করেছেন। এটি ক্ষুধামন্দা সৃষ্টি করে ওজন কমায় এবং পাকস্থলী ও অন্ত্রে অধিক সময় ধরে খাবার ধরে রেখে ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। এমনকি অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে ডায়াবেটিসের হাত থেকে রক্ষা করে। এ হরমোনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে এর কার্যকারিতা বাড়ায়, এমন ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। মুখে সেবনের এ জাতীয় ওষুধের মধ্যে আছে ভিলডাগ্গি্নপাটিন ও সিটাগ্গি্নপাটিন। লিরাগ্গ্নুটাইড এ জাতীয় ইনজেকশন। ভিলডাগ্গি্নপাটিন আমাদের দেশে পাওয়া যায়। দাম প্রতিটি ট্যাবলেট ৫০-৬০ টাকা। এক্সিনাটাইড ইনক্রিটিনের মতো কাজ করে এমন একটি নতুন আবিষ্কৃত ওষুধ।

অধ্যাপক ডা. এমএ জলিল আনসারী
ডায়াবেটিস এবং হরমোন রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতল