কাঁধের জোড়া ছুটে যাওয়ার প্রবণতা ও করণীয়

0

কাঁধের জোড়া ছুটে যাওয়ার প্রবণতা ও করণীয়
কাঁধের জোড়া ছুটে যাওয়ার প্রবণতা ও করণীয়
॥ তানভির আহমেদ ॥  কাঁধ শরীরের এক অংশ যা তিনটি হাড়, চারটি জোড়া এবং ত্রিশটি মাংসপেশির সমন্বয়ে তৈরি। ত্রিশটি মাংসপেশির মধ্যে চারটি পেশি এবং চারটি জোড়ার মধ্যে একটি জোড়া (গ্লেনো-হিউমেরাল জয়েন্ট) খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মানব শরীরে কাঁধের জোড়া গঠনগতভাবে খুবই অস্থিতিশীল কিন্তু অন্যান্য জোড়া থেকে সবচেয়ে বেশি নড়াচড়া হয়। ফলে অতি সহজেই এ জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হয় বা ছুটে যায়। কোনো জোড়া একাধিকবার ছুটে গেলে তাকে রিকারেন্ট (বারবার) ডিসপ্লেসমেন্ট বা রিকারেন্ট সাবল্যাক্সশন বলে।

একবার জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হলে পরবর্তীতে জোড়া ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে শতকরা ৮৬.৬ ভাগ এবং প্রথম আঘাতের ২ বছরের মধ্যে শুরু হয়। আঘাতের কারণে আঘাতের দিকে কাঁধের জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হয় শতকরা ৬০ ভাগ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হয় সামনের দিকে (৯৫%)।

পেছনের দিকে ৪% ভাগ এবং নিচের দিকে ১% ভাগ ডিসপ্লেসমেন্ট হয়। জন্মগতভাবে জয়েন্টের লিগামেন্ট ও ক্যাপসুল ঢিলা থাকলে জয়েন্ট সবদিকে ডিসপ্লেসমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একে বহুদিক অস্থিতিশীল জোড়া বলে। ক্রিকেট, ভলিবল, বাস্কেটবল, জ্যাবলিন থ্রো খেলোয়াড়দের মাঝে কাঁধের জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্টের সম্ভাবনা বেশি। মৃগী রোগীর খিঁচুনির এবং ইলেকট্রিক শকের কারণে জোড়া ছুটে যায় পেছনের দিকে।

স্ট্রোক এবং পেশি দুর্বলতা রোগের জন্য বেশি দুর্বল হলে জোড়া ছুটে যায়। এছাড়াও প্রথম ডিসপ্লেসমেন্টের পর পরিচর্যা ভালোভাবে না হলে জোড়া বারবার ছুটে যায়। জোড়া ডিসপ্লেসমেন্ট হলে কাঁধে ব্যথা হয়। তবে বারবার জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হলে কাঁধে কম ব্যথা অনুভব হয়। জোড়া ছুটে যাওয়ার পর বাহু একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকে এবং নাড়ানো যায় না। মাঝে মাঝে জোড়া কিছুটা ডিসপ্লেসমেন্টে হয়। এক্ষেত্রে শুধু ব্যথা অনুভব হয়।

জয়েন্ট ডিসপ্লেসমেন্ট হলে জয়েন্টের জায়গায় ফাঁকা এবং ডিসপ্লেসমেন্টের জায়গায় ফুলা দেখা যাবে। কখনো কখনো ঘুমের মধ্যে, সাঁতার দেওয়া এবং খেলার সময় বাহুর একটা নির্দিষ্ট নড়াচড়ার জন্য কাঁধের জোড়া ছুটে যায়। উপরে কিছু ধরতে হাত বাড়ালে বা বাসের হ্যান্ডেল ধরে বাসে উঠতে চেষ্টা করলে জোড়া ছুটে যেতে পারে । জোড়া প্রথম ডিসপ্লেসমেন্ট হওয়া ৪০% রোগীর ক্ষেত্রে হিউমেরাল হেডে ফ্র্যাক্চার বা হিল স্যাক্স লেশন হয়।

বারবার জোড়া ডিসপ্লেসমেন্টের জন্য গ্লেনয়েড রিম (বোনি ব্যাংকার্ট) ভেঙে যায় এবং জোড়ায় অসটিওআর্থ্রাইটিস হয় এবং জয়েন্ট নষ্ট হয়। জয়েন্টে পেইন হয় এবং জোড়া স্টিফ হয় বা জমে যায়। বয়স্কদের জোড়ার পেশি ছিঁড়ে যায় এবং হাত উপরে তুলতে পারে না। স্ক্যাপুলার অনিয়মত মুভমেন্ট হয়, পেশি শুকিয়ে যায় এবং পিঠে ব্যথা হয়।

করণীয় : কাঁধের জোড়া ডিসপ্লেসমেন্টের চিকিৎসার আগে এক্সরে, আর্থ্রোগ্রাফি, আলট্রাসনোগ্রাফি বা এমআরআই-এর মাধ্যমে রোগের ডায়াগনোসিস করতে হবে। এক্স-রে এর বিভিন্ন ভিউ, রোগীর অসুবিধা এবং রোগীকে শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে অতি সহজেই এই রোগ ডায়াগনোসিস করা সম্ভব।

বারবার জোড়া ছুটে যাওয়ার মেডিক্যাল বা কনজারভেটিভ চিকিৎসা খুবই সীমিত এবং সার্জিক্যাল চিকিৎসাই প্রধান। বাহুর যে মুভমেন্টে কাঁধের জোড়া ছুটে যায়, সে ধরনের মুভমেন্ট না করা এবং পেশি শক্তিশালী হওয়ার ব্যায়ামের সাহায্যে কিছু সময়ের জন্য সুস্থ থাকা যায়। বিভিন্ন পদ্ধতির অপারেশন করা যায়, তবে প্রতিটিরই সুবিধা ও অসুবিধা আছে। এর মধ্যে ‘ল্যাটারজেট’ পদ্ধতিতে অপারেশন করা হলে জোড়ার স্থিতিশীলতা বেশি হয়।

বর্তমানে জোড়ার চিকিৎসায় সফল ও কার্যকর সমাধান এনেছে বিস্ময়কর আথ্রর্োস্কোপিক সার্জারি। অর্থোপেডিক চিকিৎসা বর্তমান যুগের সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক পদ্ধতি। ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরাযুক্ত আথ্রর্োস্কোপ জোড়ায় প্রবেশ করিয়ে এবং যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত বাইরে মনিটর দেখে ল্যাবরাম, ক্যাপসুল ও লিগামেন্ট রিপেয়ার করা হয়। এ পদ্ধতিতে রোগী অতি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠে।

তথ্য-
ডা. জি এম জাহাঙ্গীর হোসেন, কনসালটেন্ট
হাড়, জোড়া, ট্রমা এবং আথ্রর্প্যাস্কোপিক সার্জারি
ফোন : ০১৭৪৬-৬০০৫৮২