মৃগীরোগী শিশুর মা-বাবার করণীয়

0

মৃগীরোগী শিশুর মা-বাবার করণীয়
মৃগীরোগী শিশুর মা-বাবার করণীয়
॥ ডা. মফিজুর রহমান ॥  এপিলেপসি বা মৃগীরোগ স্নায়ুতন্ত্রের একটি দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) রোগ। দীর্ঘস্থায়ী রোগে যারা ভোগে অথবা রোগের কারণে নিজেদের অন্যদের চেয়ে পৃথক বলে ভাবতে থাকে, তারা রোগ নিয়ে লজ্জিত ও অসহায় বোধ করে। মৃগীরোগে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রেও এ কথাটি সত্য।

একটি শিশু যখন মৃগীরোগী হিসাবে চিহ্নিত হয়, তখন তার মধ্যেও মানসিক চাপ, অস্বস্তিকর অনুভূতি, হতাশা, রাগ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়, তার আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তার রোগ এবং ওষুধ সম্পর্কে তার মনে প্রশ্ন জাগে, কিন্তু হয়তো সে কোনো সদুত্তর খুঁজে পায় না। উপরন্তু রোগের কারণে সঙ্গী-সহপাঠীদের ‘টিজ’-এর শিকার হয় শিশু। এ সময় শিশুকে মৃগীরোগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাবা-মা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

শিশুকে রোগ সম্পর্কে জানান
শিশুর কাছে তার রোগ সম্পর্কে লুকোছাপা করা বা মিথ্যা তথ্য দেওয়া অনুচিত। এতে শিশু বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, স্বাভাবিক জীবনযাপনে উৎসাহ হারায়। সন্তানের কাছে তার রোগের ব্যাপারে আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব খুলে বলুন। আপনি এ বিষয়ে অজ্ঞ হলে রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে উদ্যোগী হোন। নিজে শিশুর কাছে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে না পারলে অভিজ্ঞ কারো সহায়তা নিন। এ ব্যাপারে কোনো লুকোছাপা না করে শিশুকে প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে দিন। এ রোগে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তাকে বুঝিয়ে বলুন।

ইতিবাচক হোন
যদিও মৃগী একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, কিন্তু তা আপনার শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে যেন অচল করে না দেয়, সেদিকে ল্য রাখুন। মৃগীতে আক্রান্ত বলে শিশু পড়াশোনা করতে পারবে না বা কোনো সৃজনশীল বা দৈনন্দিন কাজে সক্ষম বা পারদর্শী হবে নাÑ এমন নেতিবাচক ভাবনা ঝেড়ে ফেলুন। আবার, রোগাক্রান্ত বলে শিশুর প্রতি মমত্ব দেখিয়ে সব অন্যায় আবদার মেনে নিতে হবেÑ এমনটিও নয়। তাকে অন্যদের মতোই স্বাভাবিক শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনে উৎসাহিত করুন।

নিয়মিত ওষুধ খাওয়ান, চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
মৃগীরোগীর ওষুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে অত্যন্ত মনোযোগী হতে হবে। নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত ওষুধ খাওয়াতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না, এমনকি বেশ কয়েকদিন ধরে খিঁচুনি বন্ধ থাকলেও ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে। চিকিৎসকের সঙ্গে শিশুর সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন এবং শিশুকেও তার সমস্যা সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছে খোলামেলা হতে উদ্বুদ্ধ করুন। ওষুধ কার্যকর ভূমিকা রাখতে সময় লাগতে পারে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকের কাছে খোলামেলাভাবে সমস্যার ব্যাপারে জানালে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
ঘরে নিন বিশেষ ব্যবস্থা : মৃগী রোগাক্রান্ত শিশুর নিরাপত্তার জন্য ঘরে নেয়া উচিত বিশেষ ব্যবস্থা। যেমনÑ
ঘরের পাকা মেঝে নরম কার্পেটে ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। কার্পেটের নিচে রাখা যেতে পারে প্যাড, যাতে শিশুর হঠাৎ খিঁচুনি উঠে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেও মারাত্মক কোনো আঘাত না পায়। বাথরুম ও রান্নাঘরে ভিনাইল কুশন, কর্ক বা রাবার ব্যবহার করা ভালো।
সিঁড়ি শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। অতিরিক্ত নিরাপত্তার খাতিরে সিঁড়ির গোড়ায় কার্পেট রাখা যেতে পারে।

যদি লিফট ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে লিফটের ভেতর প্যাড ব্যবহার করে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
ধারালো কিনারাযুক্ত আসবাবপত্র প্যাড, রাবার, ফোম বা কাপড় দিয়ে মুড়ে দিন, যাতে খিঁচুনির সময় শিশু ওই ধারালো কিনারার আঘাতে আহত না হয়। অথবা গোল কর্নারযুক্ত আসবাবপত্র ব্যবহার করুন। হাতলযুক্ত চেয়ার ব্যবহার করুন। চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাব বিছানা থেকে দূরে রাখুন।

শিশুর শোয়ার বিছানার চারপাশে কুশন বা লেপ-তোশকজাতীয় কিছু রাখুন যাতে ঘুমের ভেতর খিঁচুনি উঠলেও শিশু গড়িয়ে বিছানা থেকে পড়ে না যায়। লক্ষ্য রাখুন, আক্রান্ত শিশুর বিছানা যেন বেশি উঁচু না হয়।
শিশুকে বাথটাব বা সুইমিংপুলে গোসল না করিয়ে বসে থাকা অবস্থায় শাওয়ারের নিচে গোসল করানো ভালো। কিছুটা বয়সী শিশু যারা নিজে নিজে গোসল করে, তাদের ক্ষেত্রে গোসলের সময় যেন বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ না করা হয়। বাথরুমে ছিটকিনি বা লক না থাকাই ভালো। দরজা এমন হবে যেন তা বাথরুমের বাইরের দিকে খোলে।
শিশু যেন কান্ত অবস্থায়, ঘুম বাদ দিয়ে টেলিভিশন না দেখে বা কম্পিউটার গেম না খেলে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। যে রুমে টিভি বা কম্পিউটার সেখানে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকা উচিত। মনিটরের উজ্জ্বলতা কমিয়ে দিন।

খেলাধুলায় সতর্কতা : মৃগীরোগে আক্রান্ত হওয়া মানেই জীবনের সব আনন্দ থেকে ছুটি নেয়া নয়। সতর্কতা বজায় রেখে মৃগী-আক্রান্ত শিশুও অন্য শিশুদের মতো সাধারণ যে কোনো খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে প্রয়োজনে নিরাপত্তা হেলমেট ব্যবহার করা ভালো। সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, নৌকা চালনা বা পানির কাছে খেলাধুলা করার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, এ সময় খিঁচুনি উঠে পানিতে ডুবে গেলে জীবনাশঙ্কা দেখা দেয়। তাই এসব ক্ষেত্রে সঙ্গে একজন তত্ত্বাবধায়ক থাকা ভালো, যিনি শিশুর মৃগীরোগ সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল। ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলা, যেমন পাহাড়ে ওঠা, প্যারাসুট জাম্প প্রভৃতি থেকে শিশুকে বিরত রাখুন। খিঁচুনিমুক্ত হওয়ার পরও কমপক্ষে ছয় মাস সাইকেল চালাতে না দেওয়াই উচিত।

স্কুলগামী শিশুদের ক্ষেত্রে
স্কুল-কর্তৃপক্ষের কাছে আপনার সন্তানের মৃগীরোগের কথা গোপন করবেন না। রোগী কি ওষুধ পাচ্ছে, রোগীর চিকিৎসকের ঠিকানাÑ ফোন নম্বর, আপনার ফোন নম্বর প্রভৃতি স্কুল কর্তৃপকে জানিয়ে রাখুন। প্রয়োজনে স্কুল-কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মৃগীরোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান দান করুন। তাহলে স্কুল-চলাকালীন ওষুধ খাওয়ার সময় হলে বা খিঁচুনি দেখা দিলে স্কুল কর্তৃপ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন। অনেক মৃগীরোগাক্রান্ত শিশুর কাসে পড়া বুঝতে সমস্যা হতে পারে। স্কুল-শিকের রোগের ব্যাপারটি জানা থাকলে তিনি আপনার শিশুর পড়ালেখাজনিত সমস্যায় আরো বেশি সহযোগিতা করতে পারবেন।

স্কুলের অন্য শিশুদের সঙ্গে আপনার রোগাক্রান্ত শিশুকে মিশতে উদ্বুদ্ধ করুন। সহপাঠী ও তার অভিভাবকদের বুঝতে দিন বা বোঝান, মৃগী কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। সহপাঠীদের বাসায় দাওয়াত করুন যাতে মৃগীরোগীর সুস্থ থাকাকালীন পারিবারিক পরিবেশের স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটে।

মিশতে দিন অন্য মৃগীরোগীর সঙ্গে
মৃগীরোগাক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে আপনার শিশুকে পরিচয় করিয়ে দিন, তাদের সঙ্গে মিশতে দিন। এতে করে শিশু একাকিত্ব বোধ করবে না এবং হীনম্মন্যতায় ভুগবে না। একই রোগে আক্রান্তদের মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় তাদের এ রোগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আরো সহায়তা করবে।