ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

0

সুন্দরবনের শেলা নদীতে এখন তেলের ছড়াছড়ি। সেই সঙ্গে বাতাসে ভেসে আসছে তেলের গন্ধ। মঙ্গলবার ভোরে শেলা নদীর বাদামতলা খালের মুখে ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন নামে তেল বোঝাই ট্যাংকার ডুবে গিয়ে তাতে থাকা তেল নদীতে ভেসে এ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে শেলা নদীর ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথেই নজরে আসে নদীর পানিতে তেল আর তেল ভাসছে।

শুধু শেলা নদী নয়, বনের অভ্যন্তরের বিভিন্ন খাল ও পার্শ্ববর্তী পশুর নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল আর পানি মিলে একাকার। মংলার প্রায় ২০ কিলোমিটার অদূরে ডুবে যাওয়া ট্যাংকার অবশেষে ৬০ ঘন্টা পর বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার করা হয়েছে। ট্যাংকার থেকে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া তেল আগামী তিন দিনে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করেছে সংশ্লিষ্টকর্তৃপক্ষ। এদিকে পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেলা নদী দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ডুবরিরা তল্লাশি চালিয়ে নিখোঁজ ট্যাংকারের মাস্টার মোকলেসুর রহমানের কোন সন্ধান পাননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ও আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ বলেন, সুন্দরবনের যে অঞ্চলে ট্যাংকারটি ডুবেছে ওই এলাকা বিপন্নপ্রায় শুশুকসহ বেশ কয়েকটি জলজ প্রাণীর অভয়াশ্রম। এ অঞ্চল দিয়ে জাহাজ চলাচলই নিষিদ্ধ রাখা উচিত। তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, শুশুক বা ডলফিন জাতীয় প্রাণীগুলো পানির উপরে উঠে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে। তেলের গন্ধের কারণে তাদের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মৃত্যু ঝুঁকিও রয়েছে।

সুন্দরবন একটি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এর গাছের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মূল মাটির নিচে গিয়ে আবার উপরের দিকে উঠে। উপরের দিকে উঠে থাকা মূলের অংশটুকু দিয়ে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সিডাইসহ বেঁচে থাকার উপাদান সংগ্রহ করে। এই মূলগুলোতে তেল আটকে থাকার কারণে গাছগুলোর বৃদ্ধি আটকে যাবে। এমনকি অনেক গাছ মারাও যেতে পারে। তবে সুন্দরবনে এই ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ক্ষতির পরিমাণ কি রকম হবে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেই আসল চিত্র জানা যাবে। বৃহস্পতিবার মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সভাকক্ষে পোর্ট চেয়ারম্যান কমোডর এসআর ভুঁইয়ার সভাপতিত্বে বন্দর কর্তৃপক্ষ, বনবিভাগ ও বিপিসি’র যৌথ জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান সামছুদোহা খন্দকার বলেন, পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেলা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদিকে নদীতে ভাসমান তেল অপসারণে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা জাহাজ কাণ্ডারি-১০ মংলায় পৌঁছেছে। স্থানীয় পদ্ধতিতে ফোম দিয়ে গ্রামবাসীর মাধ্যমে নদী থেকে তেল তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এই প্রক্রিয়ায় তেল তুলে পানি পরিষ্কার করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ কর্মকর্তাদের।

স্থানীয়রা জানান, তেলের গন্ধে টেকাই দায় হয়েছে। সেই সঙ্গে পুরো নদীর পানিতে তেলের আস্তরণ থাকায় জাল ফেলতে পারছেন না এ এলাকার জেলেরা। কবে নাগাদ এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তারা। ঘটনাস্থল সংলগ্ন লোকালয় জয়মনী এলাকার বাসিন্দা আলম গাজী জানালেন, তেলের ছড়াছড়িতে নদীর পানি দূষিত হয়েছে। এ অবস্থায় এলাকার বাসিন্দারা নদীতে গোসলসহ অন্যান্য কাজে নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। বাতাসের মাধ্যমে তেলের গন্ধ এসে তাদের নাকে ঢুকছে। এ ছাড়া এ অবস্থায় নদীতে মাছ মারা যাবার আশংকাও করেন তিনি। পাশাপাশি বাতাসে তেলে গন্ধের কারণে সুন্দরবনের জীবজন্তুও মারা যেতে পারে। শ্বাসমূলের বংশ বিস্তারও বন্ধ হতে পারে। বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র সরকার ও পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমির হোসেন চৌধুরী জানান,বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল ছড়িয়ে পড়েছে। নদীর পানিতে তেলের গন্ধ। এ তেল অপসারণের আপাতত কোন ব্যবস্থা নেই।

উচ্চ পর্যায়ে এ নিয়ে বৈঠকে বসতে হবে। তেল ছড়িয়ে পড়ায় বনসহ গোটা পরিবেশের মারাত্মক দূষণ ঘটেছে। তেল ছড়িয়ে পড়ায় বিলুপ্ত প্রায় ইরাবতী ডলফিন সহ ছয় প্রজাতির ডলফিন ও ম্যানগ্রোভ জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে। এদিকে ভাসমান তেল অপসারণে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা টাগবোট কাণ্ডারি-১০ ফার্নেস অয়েলের ক্রিয়া নষ্ট করার জন্য এক ধরনের রাসায়নিক তরল পদার্থ ছড়াতে শুরু করেছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হার্বার মাস্টার কে.এম আকতারুজ্জামান আশা প্রকাশ করেন, এতে ভেসে থাকা তেল পানির নিচে চলে যাবে এবং পানির অক্সিজেননষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমবে। এই টাগবোটে ১০ হাজার লিটার তেলের দূষণ কমানোর মতো ‘অয়েল ডিসপারসেন্ট’ রয়েছে।

মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান কমোডর হাবিবুর রহমান ভূইয়া জানিয়েছেন, তেল অপসারণে করণীয় নির্ধারণে গতকাল সকালে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান শামসুজ্জোহা খন্দকারের সভাপতিত্বে বন্দর কর্তৃপক্ষ, বনবিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) এক যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় স্থানীয় জেলেদের সহায়তা নিয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে তেল অপসারণের একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেন, পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত শেলা নদী দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নদীতে ভেসে থাকা তেল স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় উত্তোলন করা হবে বলেও তিনি জানান। তিনি আরো বলেন, এই চ্যানেল ছাড়াও বিকল্প অনেক চ্যানেল রয়েছে। সেগুলিতে পথ বেশি হবে। একটু বেশি ঘুরতে হবে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায়এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।