ওষুধনীতি হালনাগাদের নামে ব্যবসায়ীদের রক্ষার চেষ্টা

0

(বিশেষ প্রতিবেদক, ই-হেলথ  টোয়েন্টিফোর ডটকম ডটবিডি)- ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিয়েই জাতীয় ওষুধনীতি হালনাগাদের প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপকমিটি খসড়া চূড়ান্ত করেছে। মূল কমিটি অনুমোদনের পর এটি কিছুদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। যদি উপকমিটির খসড়া অনুযায়ী ওষুধনীতি হালনাগাদকরণ হয় তাহলে ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ছাড়া বাকি ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম আগের মতোই নির্ধারণ করতে পারবে বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলো। এতে চরমভাবে উপেক্ষিত হবে জনস্বার্থ। চড়া দামেই ওষুধ কিনে সর্বস্বান্ত হবে রোগীরা। অথচ সরকারিভাবে সব ওষুধের দাম নির্ধারণ হলে ন্যায্য দামে ওষুধ কিনে খেতে পারত রোগীরা।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ওষুধ ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সরকারের হাতে দাম নির্ধারণের বিষয়টি ওষুধনীতিতে উপেক্ষিত হয়েছে। ঔষধ প্রশাসনের আগ্রহ ছিল সব ওষুধেরই দাম নির্ধারণের ক্ষমতা রাখতে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রুহুল আমিন বলেন, উপকমিটির খসড়াই শেষ কথা নয়। খসড়াটি মূল কমিটি আরও যাচাই-বাছাই করে     স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। তখন নতুন কিছু সংযোজন হতেও পারে। কাজেই এখনই বলা যাবে না ওষুধনীতিতে জনস্বার্থ উপেক্ষিত।

জানা গেছে, আশির দশকে জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নের পর দীর্ঘদিন অচল ছিল। ২০০৫ সালে এর হালনাগাদ হলেও তাতে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল ওষুধ কোম্পানির মালিকদের কাছেই। এখনো তা-ই হচ্ছে। তবে আশির দশকের ওষুধনীতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের নেতাকর্মীরা রাজপথে আন্দোলন করেছিলেন। সেই সময়ের বিএমএ নেতা এবং বর্তমানে বিএসএমএমইউর প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার জানান, তৎকালীন ওষুধনীতির বিভিন্ন বিষয় জনস্বার্থবিরোধী হলেও একটি বিষয় জনগণের পক্ষে ছিল। সেটি হচ্ছে ওষুধের দাম কমে যাওয়া। ওই ওষুধনীতির পরই ৭ টাকার ওষুধের দাম কমে এক টাকায় দাঁড়িয়েছিল। ৭০০ টাকার ওষুধের দাম কমে হয়েছিল ১০০ টাকা।

ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, এখন এমনভাবে ওষুধনীতি হালনাগাদ করতে হবে, যাতে ওষুধের দাম সহনীয় থাকে এবং গরিব-ধনী সব রোগীই কিনে খেতে পারে। তবে ওষুধের মান ভালো হওয়া প্রয়োজন এবং সহজেই যেন ফার্মেসিতে পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন যে ওষুধটির দাম ৪৫ টাকা, ঠিক একই ওষুধ সরকারিভাবে নির্ধারণ হলে দাম হবে বড়জোর ১৫ টাকা।

বর্তমানে প্যারাসিটামল, অ্যান্টিবায়োটিকসহ অত্যাবশকীয় যে ১১৭টি ওষুধের দাম ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ঠিক করছে, তার অর্ধেকেই বাজারে পাওয়া যায় না। এখন আর ওষুধগুলো চিকিৎসকরা প্রেসক্রাইব করেন না। লাভ কম বলে তাই কোম্পানিগুলোও এই ওষুধ উৎপাদন করে না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কোম্পানিরই। এতে কোম্পানি ও ফার্মেসির মালিকের কাছে জিম্মি হয়েই থাকতে হবে রোগী ও তাদের স্বজনদের। ওষুধগুলো ফার্মেসির মালিকরা বিক্রি করে যে যার মতো বেশি দাম রেখে ঠকাতে পারবেন রোগীদের। এখন বেশি ঠকছে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ।

কোম্পানির হাতে দাম নির্ধারণের ক্ষমতা থাকায় মাঝেমধ্যে ওষুধ মজুদের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা লুটে নেওয়া হচ্ছে। বেশি লাভের জন্য কখনো ইচ্ছা করে ভালো কোম্পানির ওষুধের পরিবর্তে বিক্রি করছে নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ। আবার কিছু ফার্মেসিতে দেখা গেছে ওষুধের গায়ের দাম থেকে বেশি রাখতে। অপারেশন চলাকালে কোনো রোগীর আত্মীয় নগদ কিংবা বাকিতে ওষুধ কিনতে এলেই এ ধরনের প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি ও ভেজাল-নকল ওষুধ বিক্রিতে এগিয়ে আছে রাজধানীর প্রধান পাইকারি ওষুধের বাজার মিটফোর্ড।

বিএসএমএমইউর মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ওষুধের দাম বেশি হওয়ায় অনেক গরিব রোগী অর্থের অভাবে কোর্স সম্পন্ন করতে পারে না। তাতে রোগ তো কমেই না, উল্টো রোগের মাত্রা বেড়ে যায়।