চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদের চাহিদা অনেক

0

■ সাইদ আরমান
অতীতে রোগীর নাড়ি দেখেই চিকিৎসকদের বলেদিত হতো রোগের খবর। শুধু তাই নয়, নাড়ি দেখে ওষুধও দিতে হতো। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার হয়েছে ব্যাপক অগ্রগতি। রোগবালাই জটিলও হচ্ছে। নানা কারণে নতুন নতুন রোগেরও সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট রোগে সুনির্দিষ্ট ওষুধ নির্বাচন না করতে পারলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম কাজই হচ্ছে রোগকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা। কিন্তু এ কাজ তো আর শুধু নাড়ি দেখে চলে না। রোগ নির্ণয় করার জন্য নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। এসব করতে হয় নানা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যবহূত হচ্ছে। সর্বাধুনিক এসব যন্ত্রপাতি চালান চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ বা মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা। চিকিৎসা-প্রযুক্তির এ ক্ষেত্রে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখনো অনেক চাহিদা আছে চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদের।

কাজ কী
হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর পরীক্ষাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য থাকে নানা যন্ত্রপাতি। রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনসিসে ব্যবহূত বিভিন্ন চিকিৎসা-যন্ত্রপাতির পেছনে যে বা যাঁরা কাজ করেন তাঁরাই চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ। মহাখালী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদদের পরীক্ষাগারে দ্রব্যের নমুনা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, পরীক্ষা সম্পন্ন করা, প্রতিবেদন তৈরি, সরবরাহ ও সংরক্ষণের কাজ করতে হয়। আর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্ট বা অণুজীববিজ্ঞানীর (মাইক্রোবায়োলজিস্ট) সরাসরি তত্ত্বাবধানে।’ তাই কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যত আধুনিক যন্ত্রপাতিই থাকুক না কেন, সেগুলো ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের কাজটা সঠিকভাবে করার জন্য চাই চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ। এককথায়, চিকিৎসাসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকেন এই পেশাজীবীরা।

চাহিদার পরিসংখ্যান
বর্তমানে দেশে উপজেলা হাসপাতালের সংখ্যা চার শতাধিক। রয়েছে ৬৪টি জেলায় ৬৪টি জেলা হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সব মিলিয়ে বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান পাঁচ শতাধিক। এর বাইরে আছে তিন হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক। বেসরকারি পরীক্ষাগার, এক্স-রে কেন্দ্র, ডেন্টাল ল্যাব তো আছেই। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তিন-চারজন চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ থাকা দরকার। সেই হিসাবে বেসরকারি পর্যায়ে তাঁদের চাহিদা আছে ১৫ হাজারের কাছাকাছি। সরকারি হাসপাতালে সৃষ্ট পদ আছে ছয় হাজারের ওপরে। সেখানেও প্রায় এক হাজার ২০০ পদ খালি রয়েছে। কিন্তু সরকারি তথ্যমতে, ১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদের সংখ্যা ১০ হাজারের কিছু বেশি। তাঁদের অনেকে আবার ইউরোপ ও আমেরিকায় চলে গেছেন। চাহিদার তুলনায় সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি অর্জনকারীর সংখ্যা অনেক কম। ফলে আমাদের দেশে দক্ষ চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদের চাহিদা অনেক।

চাহিদা কোন বিষয়ে
চিকিৎসা-প্রযুক্তি পড়ানোর প্রতিষ্ঠান সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিগুলোতে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তির জন্য ছয়টি ভিন্ন অনুষদ রয়েছে।
অনুষদগুলো হচ্ছে, ল্যাবরেটরি, রেডিওগ্রাফি, ফিজিওথেরাপি, স্যানিটারি পরিদর্শক প্রযুক্তি (এসআইটি), ডেন্টিস্ট্রি ও রেডিওথেরাপি। রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিস্টের ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক মুহাম্মদ মামুনুর রশিদ বলেন, ‘তুলনামূলক চাহিদার বিবেচনায় ল্যাবরেটরি, ফিজিওথেরাপি, রেডিওগ্রাফি ও ডেন্টিস্ট্রি ডিগ্রিধারীদের চাহিদা বেশি। তাই যাঁরা এ পেশায় আসতে চাইছেন, তাঁরা বেছে নিতে পারেন এসব বিষয়। তবে অন্য বিষয়গুলোর চাহিদাও অনেক।’
সরকারি তিনটি প্রতিষ্ঠানে সাতটি অনুষদে (ফার্মেসিসহ) মোট আসন আছে এক হাজার ১০টি। সরকারি ও বেসরকারি উভয় মিলে ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাই পছন্দের বিষয়ে পড়তে চাইলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভালো করার কোনো বিকল্প নেই।

পড়াশোনা
চাকরির সুযোগ বিবেচনায় কেউ চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদ হিসেবে পেশা গড়তে চাইলে এসএসসি পাসের পর এখন ভর্তি হতে পারেন ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (আইএইচটি)। বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারি তিনটি আইএইচটি রয়েছে। সেগুলো ঢাকা, রাজশাহী ও বগুড়ায় অবস্থিত। সম্প্রতি ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে এসব প্রতিষ্ঠানে ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসাশিক্ষা বিভাগ। পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে আবেদনপত্র ২০ জুন থেকে বিতরণ শুরু হয়েছে। আবেদনের সুযোগ শেষ হচ্ছে আজ ৩০ জুন।সরকারি আইএইচটির বাইরে রয়েছে বেশকিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারিগুলোয় ভর্তি-প্রক্রিয়াও শিগগির শুরু হবে। তবে বেসরকারিগুলোর যথাযথ অনুমোদন আছে কি না, তা অবশ্যই ভর্তির আগে জেনে নিতে হবে।

ভর্তির সাধারণ যোগ্যতা
সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে ইচ্ছুক প্রার্থীকে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ২.৫০ নিয়ে এসএসসি পাস হতে হবে অথবা দাখিল (বিজ্ঞান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সব অনুষদে চাকরিরত বিভাগীয় প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। তাঁদের ক্ষেত্রে যাঁরা ন্যূনতম উচ্চমাধ্যমিক পাস, কেবল তাঁরাই আবেদন করতে পারবেন।

ভর্তিপরীক্ষা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যেক প্রার্থীকে সরকারি আইএইচটিগুলোতে ভর্তির জন্য এসএসসি সিলেবাস অনুযায়ী ১০০ নম্বরের এক ঘণ্টার লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। পরীক্ষার প্রশ্ন হবে বহুমুখী নির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) ধরনের। সাতটি বিষয় থেকে প্রশ্ন হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান। সাধারণ জ্ঞান বাদে প্রতিটি বিষয় থেকে ১৫ নম্বরের প্রশ্ন থাকবে। আর সাধারণ জ্ঞানে থাকবে ১০ নম্বর। কোনো মৌখিক পরীক্ষা হবে না। লিখিত পরীক্ষা ও এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মেধাতালিকা তৈরি করা হবে।

স্নাতক পড়ার সুযোগ আছে
মুহাম্মদ মামুনুর রশিদ জানান, এক-দুই বছর আগেও চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল না। ২০০৮ সালে এই সুযোগ সৃষ্টি হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি পর্যায়ে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিস্টে এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্নাতক কোর্স আছে।

বেতন-ভাতা ও পদোন্নতি
চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদের চাকরি সরকারের তৃতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদার। তাই যাঁরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেবেন তাঁরা সেই মোতাবেক বেতন পাবেন। তবে রয়েছে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ। মো. মতিউর রহমান জানান, বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদের বেতন প্রায় আট হাজার থেকে শুরু হয়ে থাকে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে বেতন তো বাড়বেই। এ ছাড়া সরকার বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও তাঁরা পাবেন।
বাংলাদেশে গতানুগতিক ধারার শিক্ষা অর্জন করে অসংখ্য তরুণ-তরুণী বেকার রয়েছে। সেখানে চিকিৎসা-প্রযুক্তিবিদের সংখ্যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই চাহিদার তুলনায় কম। ফলে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। তাই যাঁরা পড়াশোনা শেষ করে দ্রুত চাকরি পেতে চান, ভর্তি হয়ে যান কোনো প্রতিষ্ঠানে।