কুষ্ঠ রোগ অভিশাপ নয়

0

কুষ্ঠ রোগ অভিশাপ নয়
কুষ্ঠ রোগ অভিশাপ নয়
॥ ডা. মুনতাসীর মারুফ ॥  বিনামূল্যে কার্যকর আধুনিক চিকিৎসা সহজলভ্য হলেও সামাজিক সচেতনতার অভাবে কুষ্ঠ রোগ পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না। লজ্জা, ভয়, পাপবোধ, দ্বিধা, স্বাস্থ্যশিক্ষার অভাব, গোপনীয়তা প্রভৃতি কারণে রোগীর চিকিৎসা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই সামাজিকভাবেও কুষ্ঠ রোগী হচ্ছে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। কুষ্ঠ রোগ নিরাময়ে সামাজিক বাধা দূরীকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস পালিত হয়। এ বছরও ৩০ জানুয়ারি এ দিবসটি পালিত হয়েছে।

তবে সঠিক চিকিৎসায় কুষ্ঠ রোগ ভালো হয়ে যায় এবং চিকিৎসা শুরুর ২ সপ্তাহ পরই ওই রোগী থেকে রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা আর থাকে না। সে কারণে প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আক্রান্ত ত্বকের রস পরীক্ষায় রোগের জীবাণু নিশ্চিত হওয়া যায়। কুষ্ঠ রোগ চিকিৎসায় ‘মাল্টি-ড্রাগ থেরাপি’ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। রিফামপিসিন, ক্লোফাজিমিন, ড্যাপসোন প্রভৃতি ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদে এ রোগের জন্য চিকিৎসা চালাতে হয়। রোগের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ৬ মাস থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত ওষুধ খাওয়া লাগতে পারে। আমাদের দেশে বিনামূল্যে সরকারিভাবে কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।কুষ্ঠ রোগে প্রধানত ত্বক ও স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়। রোগের শুরুতে ত্বকে সাদা, লালচে বা হালকা ফ্যাকাসে ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।

মুখমন্ডল, নিতম্ব, হাত ও পায়ের ত্বকই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। সঙ্গে জ্বর, ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা প্রভৃতি উপসর্গ থাকতে পারে। আক্রান্ত স্থান ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন হতে থাকে। অর্থাৎ সেসব স্থানে বোধশক্তি থাকে না। ফলে পরবর্তীতে এসব জায়গায় আঘাত পেলে, পুড়লে, কাটলে ব্যথা হয় না। আক্রান্ত স্থানে ঘা দেখা দেয়। তবে আক্রান্ত সব স্থানই অনুভূতিহীন নাও হতে পারে। এই অনুভূতিহীনতা নির্ভর করে রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর। দেহের কোনো কোনো স্থানের ত্বক মোটা বা গুটির মতো হয়ে যায়। স্নায়ুতন্তু আক্রান্ত হয়ে দড়ির মতো শক্ত হয়ে যায়। কোনো কোনো স্নায়ুর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। অনেকের হাতের মাংসপেশি শুকিয়ে যায়, কান বা কানের লতি মোটা হয়, হাত বা পায়ের আঙুল বাঁকা হয়ে যায়, চোখের ভ্র্বর বাইরের অংশের চুল পড়ে যায়। কারো কারো চোখ এবং অন্ডকোষও আক্রান্ত হয়। কোনো কোনো ৰেত্রে হাত বা পায়ের আঙুলে ঘা হয়ে আপনাআপনি খসে পড়ে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করালে আক্রান্ত ব্যক্তি বিকলাঙ্গও হয়ে যেতে পারে।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকেই ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে কুষ্ঠ রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এ রোগ চার হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। প্রাচীন মিসর ও চীনা সভ্যতার গোড়ার দিক থেকেই এ রোগের আবির্ভাবের কথা শোনা যায়। অথর্ববেদ ও বাইবেলেও এ রোগের উল্ল্যেখ পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে কুষ্ঠ রোগকে মনে করা হতো সৃষ্টিকর্তার অভিশাপের ফল। এ রোগ নিয়ে নানা কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা তো করা হতোই না, বরং তাদের সমাজচ্যুত করে নগরের বাইরে বহুদূরের কোনো পরিত্যক্ত স্থানে নির্বাসিত করা হতো। আদতে কুষ্ঠ এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত এবং নিরাময়যোগ্য রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘লেপ্রোসি’। ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি’ নামক ব্যাকটেরিয়া এই রোগের জন্য দায়ী।

১৮৭৩ সালে নরওয়ের বিজ্ঞানী জিএইচএ হ্যানসেন এই জীবাণু আবিষ্কার করেন বলে লেপ্রোসি রোগটিকে ‘হ্যানসেন’স ডিজিজ’ নামেও অভিহিত করা হয়। মানুষ ছাড়াও ‘আর্মাডিলেৱা’ নামের এক ধরনের প্রাণীর দেহে এই রোগের জীবাণু পাওয়া যায়। মানুষের ত্বকে ও নাকের আবরণী পর্দায় এ জীবাণু অনেক দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। আক্রান্ত রোগীর নিঃশ্বাসে ভাসমান জলকণা বা হাঁচি-কাশি-থুথুর মাধ্যমে এ রোগজীবাণু ছড়াতে পারে। কুষ্ঠ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার কয়েক মাস থেকে কয়েক বছরের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা যায়।

সাধারণত আক্রান্ত হওয়ার ২ থেকে ৬ বছরের মধ্যে রোগলক্ষণ দেখা দিলেও কিছু ক্ষেত্রে ২০ বছর পরও লক্ষণ প্রকাশ পেতে দেখা গেছে। তবে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষেরই প্রাকৃতিকভাবে এই রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা রয়েছে। যাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, তারা সহজে এ রোগে আক্রান্ত হয় না। সাধারণত সব ধরনের  কুষ্ঠ রোগ ছড়ায় না। রোগটিকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়। অধিক রোগজীবাণুসম্পন্ন এবং কম রোগজীবাণুসম্পন্ন। অধিক রোগজীবাণুসম্পন্ন রোগীরাই কুষ্ঠ রোগ ছড়ানোর প্রধান উৎস। এক সময় মনে করা হতো, কুষ্ঠ যৌনবাহিত রোগ। তবে এখন জানা গেছে, এ ধারণা ঠিক নয়।