ইয়োগা বা যোগব্যায়াম কি শুধুই শরীরচর্চা?

0

প্রাচ্যের যোগব্যায়ামকে পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ চেনেন ‘ইয়োগা’ নামেই। প্রচলিত ধারণায় ধ্যানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক মুক্তিলাভের জন্যই এর চর্চা শুরু হয়েছিল। কিন্তু এই যোগব্যায়াম কি আসলেই আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত, নাকি এটা নেহাতই শরীরচর্চা? নানা দেশে এ নিয়ে বিতর্কটা পুরোনো হলেও সম্প্রতি ‘ইয়োগা ট্যাক্স’ আরোপের সিদ্ধান্তে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বিবিসি এক খবরে এ তথ্য জানা গেছে।

দুনিয়ার নানা প্রান্তে যোগব্যায়ামের সংজ্ঞা নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির যোগব্যায়াম চর্চাকারীরা এ নিয়ে এক অদ্ভুত সমস্যাতেই পড়েছেন। ১ অক্টোবর থেকে ওয়াশিংটন ডিসির সব ফিটনেস সেন্টার বা শরীরচর্চা কেন্দ্রের ওপর ৫ দশমিক ৭ ভাগ ‘সেলস ট্যাক্স’ আরোপ করেছে স্থানীয় সরকার। এমনকি ইয়োগা স্কুলগুলোকেও এই করের আওতায় রেখেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেখানকার যোগব্যায়ামকারীরা কোনোভাবেই এই কর দিতে রাজি নন। যুক্তি হিসেবে তাঁরা বলছেন, তাঁদের যোগাসনচর্চা নেহাত ‘শরীরচর্চা’ নয়।

এই কর-কে ‘ইয়োগা ট্যাক্স’ হিসেবে উল্লেখ করে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে যুক্তরাষ্ট্রে। যদিও এই কর নিয়ে সরকারের ভাষ্যে কোথাও ‘ইয়োগা’ শব্দটির উল্লেখ নেই। সরকার বলছে, ‘শরীরচর্চার উদ্দেশ্যে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়’ এমন স্কুল বা ফিটনেস সেন্টারগুলোর ওপর এই কর প্রযোজ্য হবে। আর এ বিষয়টি সামনে নিয়ে এসে ইয়োগা স্কুলগুলোর চর্চাকারীরা বলছেন, এ কারণেই তাঁদের ওপর এই কর আরোপ হওয়া মেনে নেওয়া যায় না।

কিন্তু দুনিয়ার বহু জায়গাতেই জিম বা শরীরচর্চা কেন্দ্রগুলোতে যে ধরনের যোগব্যায়ামের চর্চা হয়, তার সঙ্গে হিন্দু বা বৌদ্ধ সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত যোগাসনচর্চার তেমন কোনো সম্পর্কই নেই। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইয়োগা অ্যালায়েন্সের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড কারপেল বলেন, শরীরচর্চাটা ইয়োগার একটা বাই প্রোডাক্ট বা উপজাত বিষয়। যেমনটা নৃত্যকলা বা চীনা মার্শাল আর্ট ‘তাই চাই’-এর ক্ষেত্রেও ঘটে। কারপেল আরও বলেন, ‘বিশেষায়িত ইয়োগা স্টুডিওগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে—মন, শরীর ও আত্মাকে সংহত করা। শরীর ঠিকঠাক থাকা আর সুখী জীবনযাপন করা এর ফলাফল মাত্র।’

বিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ায় বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে ভারতীয় যোগব্যায়াম ও যোগসাধনার নানা ঘরানা। আর যুক্তরাষ্টের মধ্যে নিউইয়র্কেই এই জাতীয় যোগব্যায়ামের চর্চা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু ওয়াশিংটনে এখন ‘ইয়োগা ট্যাক্স’ আরোপের চেষ্টা করলেও যোগব্যায়াম ‘পুরোপুরি শরীরচর্চা নয়’ বলে উল্লেখ করে ২০১২ সালে নিউইয়র্ক রাজ্য স্থানীয় সেলস ট্যাক্স থেকে অব্যাহতি দেয় ইয়োগা স্কুলগুলোকে।

কিন্তু ইয়োগা প্রচারকেরা অবশ্য প্রায়ই এর থেকে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে থাকেন, তাঁরা বলেন, আদতে যোগাসনের চর্চা কোনো আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড নয়। ইরানে শরিয়া আইনের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে যোগব্যায়ামের শিক্ষকেরা সব সময়ই এ বিষয়ে কথা বলার সময় সতর্কভাবে ‘স্পোর্ট অব ইয়োগা’ বা ‘যোগ ক্রীড়া’ বলে থাকেন। মালয়েশিয়ায় ২০০৮ সালের এক ফতোয়া বলে পাঁচটি রাজ্যে আধ্যাত্মিক যোগসাধনা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানে দেশটির রাজধানী কুয়ালালামপুরে যোগ ক্লাসের সময় তন্ত্রপাঠ এবং মেডিটেশন বা ধ্যান করা নিষিদ্ধ।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ডিয়েগোর আদালত ২০১৩ সালের এক রায়ে বলেছেন, ঐতিহাসিকভাবে যোগব্যায়ামের উৎপত্তি ধর্মীয় শেকড় থেকে হলেও এর আধুনিক কোনো সংস্করণের প্রশিক্ষণ ‘রাষ্ট্র ও গির্জার পৃথককরণের’ বিধান লঙ্ঘন করে না। তবে, ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার কর কর্তৃপক্ষ সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছে, তাঁরা নিশ্চিত—ইয়োগা একটা শরীরচর্চা, তাই অন্য কোনো রাজ্যে তা আরোপিত হোক বা না হোক কলম্বিয়ায় এটা করের আওতাতেই থাকবে।